মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯

বিপিএলে অনিয়ম, বিসিবি সভাপতিই সব জানেন বলে দায় সারলেন নাছির!

প্রকাশিতঃ ১৬ জানুয়ারী ২০২৩ | ৮:৪৩ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রাম : ২০১২ সালে তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের হাত ধরে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবেই যাত্রা শুরু করেছিল বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ)। সেই সময়ে আইপিএলের পরের অবস্থানে বিবেচিত হওয়া টুর্নামেন্টটি এখন পিএসএল, বিগব্যাশের সঙ্গেও তুলনায় যেতে পারছে না।

শুধু তাই নয়, এবারই শুরু হতে যাওয়া দুবাইয়ের আইএলটি২০ কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের সঙ্গে টক্কর দিতে পারছে না বিপিএল। দিন দিন টুর্নামেন্টটি জৌলুস হারিয়ে জীর্ণশীর্ণ দায়সারা এক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে ডিআরএস ছাড়াই চলছে এবারের আসর। দিন যত যাচ্ছে, আয়োজনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেটের মান নিম্নগামী হচ্ছে এখানে। ঘরোয়া এই আসর থেকে নতুন খেলোয়াড় তো বের হয়-ই না, উল্টো খেলার বাইরে নানা বিতর্কে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

এমন অবস্থায় বিপিএল নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসলেন ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। বিপিএলে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি তিনি বললেন, ‘একটা যা তা অবস্থা। এর থেকে আমাদের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আরো ভালো হয়’- নিজে দায়িত্ব পেলে এক-দুই মাসের মধ্যেই সব ঠিক করতে পারবেন বলে জানান তিনি।

সাকিব আল হাসানের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন দেশের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও। গত ৫ জানুয়ারি তিনি বললেন, ‘এবারের বিপিএল অনেকটাই বিশৃঙ্খল। ইচ্ছা করলে এ টুর্নামেন্টকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যেত।’

বিপিএলের প্রাপ্তি নিয়ে গত বছরও প্রশ্ন তুলেছিলেন জাতীয় দলের টেস্ট ও টি২০ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকা এই আসরের মান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। হতাশ সাকিব বলেছিলেন, ‘বিপিএলের প্রতিটি আসর থেকে অন্তত দুইজন করে ক্রিকেটার বের হওয়া উচিত। কিন্তু আমার দেখামতে, সাইফউদ্দিন ও শেখ মেহেদি ছাড়া বিপিএলের আট আসর থেকে আর কাউকে বের হতে দেখিনি। এটা একটা বড় হতাশার জায়গা।’

তবে বিপিএলের সবেধনে নীলমণি এ দুই আবিষ্কার এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের তেমনভাবে মেলে ধরতে পারেননি। সাইফউদ্দিন অবশ্য অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দিয়েই নজরে এসেছিলেন। বিপিএলে দাপট দেখিয়ে জাতীয় দলে আরও একজন জায়গা করে নিয়েছিলেন, তিনি সাকিবেরই দল ফরচুন বরিশাল সতীর্থ মুনিম শাহরিয়ার। বিপিএলে মারকাটারি ব্যাটিং করা এ ওপেনার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাটে বলই লাগাতে পারেন না। পাঁচটি টি২০-তে সুযোগ দেওয়ার পর তাঁকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে জাতীয় দল থেকে।

বিপিএলের আরেক আবিষ্কার শেখ মেহেদিও উল্লেখ করার মতো কিছু করতে পারেননি। যার মানে দাঁড়ায়, এখানে আসলে মানসম্পন্ন ক্রিকেট হয় না। অথচ আইপিএল থেকে জাসপ্রিত বুমরা, সূর্যকুমার যাদবের মতো সুপারস্টার বেরিয়ে এসেছেন। পিএসএল থেকে নজর কেড়েছেন শাদাব খান, হারিস রউফ, ইফতেখার আহমেদ, খুশদিল শাহর মতো টি২০ স্পেশালিস্ট। এমনকি উইন্ডিজের সিপিএল থেকে রোভম্যান পাওয়েল, কাইল মায়ার্স, ব্রেন্ডন কিং, ওডেন স্মিথের মতো ক্রিকেটার বেরিয়ে এসেছেন।

বিপিএলের গত আট আসরের রান সংগ্রাহক ও উইকেট শিকারিদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে, নতুন কোনো প্রতিভাই নেই। ব্যাটিংয়ে দেশিদের মধ্যে দাপট তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ইমরুল কায়েসের মতো পরিচিত মুখদের। বোলিংয়েও সাকিব, মাশরাফি, মুস্তাফিজ, রুবেলের মতো পুরোনোই।
বিপিএলের আরেকটি হতাশার জায়গা হলো উইকেট। এত নিম্নমানের উইকেট সম্ভবত পৃথিবীর কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে দেখা যায় না। এর জন্য অবশ্য আয়োজকরা মাঠের স্বল্পতাকে দায়ী করেন। মিরপুর স্টেডিয়াম মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হয় বলে এখানে মানসম্পন্ন উইকেট তৈরি সম্ভব নয় বলে অনেকবারই জানিয়েছেন বিসিবির কিউরেটররা।

তাই এসব উইকেটে সুযোগ পেলেও অধিকাংশ দেশি ক্রিকেটার নিজেদের মেলে ধরতে ব্যর্থ হন। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের বিনিয়োগ ফেরানোর ব্যবস্থা করা ও স্থায়ী হওয়ার সুযোগও দেওয়া হয় না। তাই দল নিয়ে লম্বা পরিকল্পনা করতে পারেন না তাঁরা। উল্টো অর্থকড়ি লোকসান দিয়ে ক’দিন পরেই মালিকানা ছেড়ে দেন। ফলে বছর বছর নতুন নতুন মালিক, নতুন নতুন নামে ফ্র্যাঞ্চাইজি আসায় টুর্নামেন্টটি এখনও দাঁড়াতে পারছে না।

অন্যদিকে বিপিএলে এবার ডিআরএসের সম্পূর্ণ সুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত নিতে তাই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তৃতীয় আম্পায়ারদের। আম্পায়ারদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের তর্কের ঘটনা হচ্ছে হরহামেশা। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে জড়িয়েছিলেন এনামুল হক বিজয়ও।

রংপুরের বিপক্ষে সে ম্যাচে তখন ১৫ রানে ব্যাট করছিলেন বিজয়। রেজাউর রহমান রাজার চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে সুইপ করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু লাইন মিস করলে বল লাগে প্যাডে। খালি চোখে মনে হচ্ছিল লেগ স্টাম্পের বাইরে রয়েছে বল। মাঠের আম্পায়ার তাই আউট দেননি। বোলার রাজা নিলেন রিভিউ। রিপ্লেতেও মনে হচ্ছিল লেগ স্টাম্প মিস করবে বল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পাল্টে আউট দেন তৃতীয় আম্পায়ার। তখন বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে আম্পায়ারের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছিলেন বিজয়। যে কারণে পরে গুনতে হয়েছে জরিমানা।মূলত এডিআরএস নামক আংশিক ডিআরএসের কারণেই হচ্ছে এমনটা।

এবারের বিপিএলে দেশ সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান পর পর দুই ম্যাচেই আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওয়াইডের সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ায় আম্পায়ারের দিকে তেড়ে গেছেন। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ইনিংসের শুরুতে কে স্ট্রাইক নিবেন? তা নিয়ে আবেগতাড়িত বরিশাল ক্যাপ্টেন সাকিব মাঠে ঢুকে আম্পায়ারের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে মাঠে উত্তেজক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটান। সব মিলিয়ে বিপিএলে একটা উত্তেজক অবস্থা বিরাজমান। আম্পয়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে খেলোয়াড়রা অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

এবারের বিপিএলের মান নিয়ে অনেকের অসন্তুষ্টি আছে। কারণ, ছয় মাস আগে শিডিউল করা বিপিএলে ডিআরএস নেই। অথচ এর পরে শিডিউল করা বিদেশি অনেক টুর্নামেন্টে ডিআরএস নিশ্চিত করতে পেরেছেন আয়োজকরা।

আয়োজনের নানা দিক, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে শনিবার (১৪ জানুয়ারি) বিসিবি পরিচালক আ জ ম নাছিরের কাছ থেকে জানতে চান সাংবাদিকরা; চট্টগ্রাম ইনডোর কমপ্লেক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আ জ ম নাছির দায় চাপালেন পাপনের ওপর। ঘুরে-ফিরে বলছিলেন, ‘বিসিবি সভাপতিই বলবেন, তিনি সব জানেন, সব বিষয়ে ব্যাখ্যা তিনিই দেবেন। ওনাকেই প্রশ্ন করুন!’

অবশ্য ডিআরএস প্রসঙ্গে পাপন গত ১০ জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বিপিএলে চাইলেই ডিআরএস আনতে পারতো বিসিবি। সেক্ষেত্রে ভারতের বিপক্ষে সিরিজে ডিআরএস রাখা হতো না। যেমনটা করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট। তাদের ফ্রাঞ্চাইজি লিগের কারণে এফটিপির সিরিজই বাদ দিয়েছে।’