মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯

এ বছরও খাদ্যের দাম বেশি থাকবে

প্রকাশিতঃ ২১ জানুয়ারী ২০২৩ | ১:২১ অপরাহ্ন


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : খাদ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে না। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে, ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। এ বছরও খাদ্যের দাম বেশি থাকবে বলেই মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের মতো সংস্থা।

২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল জিম্বাবুয়েতে। দেশটিতে প্রকৃত খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ১২১ শতাংশ, ২০২১ সালের একই প্রান্তিকের তুলনায়। এরপর আছে লেবানন, তাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২৯ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি জানুয়ারিতে এখনো বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্য একরকম স্থিতিশীল আছে। সংস্থাটির কৃষি সূচকের মান একই আছে। ভুট্টা ও গমের দাম যথাক্রমে ১ ও ২ শতাংশ কমেছে। তবে চালের দাম ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে চলতি জানুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে ভুট্টা ও চালের দাম ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় ৮ ও ১৩ শতাংশ বেশি।

এদিকে গত সপ্তাহেই জানা গেল, ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক বছর ধরে যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশেও মূল্যস্ফীতির হার বেশি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির। ফলে যুক্তরাজ্যের মতো সেভ দ্য চিলড্রেনের মতো বেসরকারি সংস্থা নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

২০২২ সাল ছিল সামগ্রিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বছর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের দুর্দশার অন্ত ছিল না। রয়টার্সের এক সংবাদে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের পর ২০২২ সালে খাদ্যের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতি মাসেই খাদ্যমূল্য সূচক প্রকাশ করে থাকে। তাতে দেখা গেছে, ২০২২ সালে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচকের গড় মান ছিল ১৪৩ দশমিক ৭ পয়েন্ট। ১৯৯০ সালে এফএও মূল্যসূচক প্রবর্তন করার পর যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সূচক অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে মূল্যসূচকের মান ১৮ পয়েন্ট বেড়েছে। এর ফলে ২০২২ সালে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। সব দেশে খাদ্যের দাম একই হারে বাড়েনি। আবার খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যে সব দেশে একইভাবে পড়েছে, তা-ও নয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে খাদ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। ফলে এফএওর মূল্যসূচক রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে। সে বছরের মার্চ মাসে খাদ্যমূল্য সূচক সর্বোচ্চ ১৫৯ দশমিক ৭-এ ওঠে।

এরপর এপ্রিল, মে ও জুন মাস পর্যন্ত তা যথাক্রমে ১৫৮ দশমিক ৪, ১৫৮ দশমিক ১ ও ১৫৪ দশমিক ৭ ছিল। আগস্ট মাসে তা এক ধাক্কায় ১৪০-এর ঘরে নেমে আসে। এরপর ধারাবাহিকভাবে খাদ্যের দাম কমতে থাকে। সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে তা ১৩২ দশমিক ৪-এ নেমে আসে। সামগ্রিকভাবে বছরের গড় মান দাঁড়ায় ১৪৩ দশমিক ৭।

বিশ্বের বৃহত্তম গম উৎপাদক দেশ হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন কয়েক মাস গম রপ্তানি করতে পারেনি। ফলে গমের দাম বাংলাদেশসহ বিশ্বের সবখানেই অনেকটা বেড়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বেড়েছে।

সেই সঙ্গে ২০২২ সালে বিশ্বের প্রায় সবখানেই প্রচণ্ড গরম পড়ে। প্রচণ্ড গরমে শুধু বাংলাদেশ ভুগেছে তা নয়, সারা বিশ্বই ভুগেছে। ইউরোপ মহাদেশের অনেক জায়গায় দাবদাহ বয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যে মানুষ রোদের তাপে ডিম ভাজছেন, এমন ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বেশি গরমের কারণে অনেক দেশেই খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পৃথিবীটা জ্বলন্ত উনুনের মতো হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ প্রসঙ্গে বলেন, মানবজাতি একযোগে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের পর সারের দাম তিন গুণ হয়েছে। এতে উন্নত দেশের কৃষকদের তেমন সমস্যা না হলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ছোট কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ব্যাহত হবে কৃষি উৎপাদন। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে খাদ্যচক্র অস্থিতিশীল হবে। এতে বিশ্বের ৪৫টি দেশের ২০ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে সাবসাহারা অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে। এই অঞ্চলের দেশগুলো সরাসরি রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে সার আমদানি করে। নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সার পাবে না। আবার ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাস নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় সারের উৎপাদন খরচও বাড়বে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, চলতি ২০২৩ সালেও বিশ্বে খাদ্যের দাম বেশি থাকবে। যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য, চরম আবহাওয়া—এগুলোকে তারা কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত বছর খাদ্যের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। চাপ পড়েছে খাদ্য আমদানিকারী দেশগুলোর বাজেটে।