জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরের বারকোড ফুড জংশন সম্মুখসড়কের উপর অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে দুর্ভোগ ও ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় রেস্টুরেন্টে আসা ভোক্তা-অতিথিদের গাড়ি পার্কিং করতে হয় ফ্লাইওভারের সংযোগস্থলের মতো ব্যস্ত ও গরুত্বপূর্ণ সড়কে।
সিএমপি ট্রাফিক উত্তর বিভাগের একাধিক তাগাদার পরও এতে কর্ণপাত করছেন না বলে অভিযোগ বারকোড গ্রুপের মালিক মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে। ফলে ত্যক্ত-বিরক্ত ট্রাফিক বিভাগ এই বিষয়ে শিগগির হার্ডলাইনে যাচ্ছে।
জানা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ওই স্থানে অবৈধ পার্কিংয়ের দায়ে রেস্টুরেন্টে আসা বেশ কয়েকজন ভোক্তার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করে ট্রাফিক বিভাগ। মামলার পর রেস্টুরেন্টে আসা অতিথিরা ক্ষোভ ঝাড়েন বারকোড মালিকের উপর।
এরপর এমন অবৈধ কাজকে বৈধতা দিতে এবং সড়কে পার্কিং অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন বারকোড মালিক মঞ্জুরুল হক। সেসময় নোয়াখালির এক সংসদ সদস্যের মাধ্যমে ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কাছে মনজুরুল তদবির করেন বলেও জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ওই সাংসদের হস্তক্ষেপে ট্রাফিক বিভাগের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেন মঞ্জুরুল। যার প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৩ এপ্রিল বারকোডের জিএম ফারুক এবং এন মোহাম্মদ গ্রুপের এজিএম শরীফকে পাঠিয়ে ট্রাফিক বিভাগকে ম্যানেজের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মনজুরুল। সেসময় ট্রাফিক পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন তাদের অপারগতার কথা। এরপরই ওই সড়কে ‘নো পার্কিং’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় ট্রাফিক বিভাগ।
এরপর কিছুদিন ‘নো পার্কিং’ সাইনবোর্ডটি থাকলেও বর্তমানে সেটি সরিয়ে সড়কে করা হচ্ছে পার্কিং। শুক্রবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে দেখা যায়, একজন গার্ড গাড়িগুলো সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের সহযোগিতা করেছেন। গাড়ি ঢোকা এবং বের হওয়ার সময় হাতে লাঠি নিয়ে ওই সড়কে চলাচল করা অন্যান্য গাড়ি থামাচ্ছেন তিনি। এছাড়া সড়কের মাঝামাঝি দাঁড় করানো একটি লাল গাড়িতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়া দুজন কর্মচারী খাবারের প্যাকেট তুলে দিতেও দেখা যায়। এসময় পেছনে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফ্লাইওভারের সংযোগস্থল সংলগ্ন মোড়ে যানজট নিরসনে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল বলেন, ‘এটি নগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক। বারকোডের কাস্টমারদের ব্যাক্তিগত গাড়ি অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকে। অবৈধ পার্কিং বন্ধে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ‘নো পার্কিং’ সাইনবোর্ডও লাগিয়েছিল। আমরাও ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিং না করতে প্রায়শ অনুরোধ করি। মামলা দিয়েও তাদের থামানো যাচ্ছে না। অনেকটা গায়ের জোরেই অবৈধ পার্কিং করা হচ্ছে।’
বেশ কয়েকজন গাড়িচালকের সাথে কথা হলে যানজটের কারণ হিসেবে তারা বারকোড রেস্টুরেন্টের অবৈধ পার্কিংকে দোষারোপ করেন।
তাদের মধ্যে শাহাবুদ্দিন নামে এক সিএনজি চালক বলেন, ‘এখানে তো প্রাইভেট কার, মাইক্রো ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি তারা দাঁড়াতে দেয় না। পুলিশ যতক্ষণ বলে ততক্ষণ ঠিক থাকে, পুলিশ চলে গেলে আবার আগের মতো। সারাক্ষণ এখানে জ্যাম লেগেই থাকে। আসলে ভাই তাদের ক্ষমতা আছে, তাই তো রেস্টুরেন্টে ঢুকতে মেইন রোডের উপর বড় সিঁড়ি বসাতে পারছে।’
এ ব্যাপারে সিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘রাতের বেলা ট্রাফিকের চাপ কমে আসে, যার কারণে আমাদের মুভমেন্টও একটু স্লো হয়ে যায়। আমি যেটা খেয়াল করেছি, সন্ধ্যার পর রাতের দিকে তারা এই সুযোগটা নেয়। আমার কাছে কিছু অভিযোগও এসেছে যে, তারা রাস্তার উপর গাড়িগুলো এলোমেলো করে রেখে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা মিটিং করে হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হার্ডলাইন বলতে এমন একটি পরিকল্পনা করেছি, যার ফলে ওই জায়গায় গাড়ি পার্কিং খুবই টাফ হবে।’
নো পার্কিং বোর্ড সরিয়ে ফেলায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি; বলেন, ‘এটি তুলে ফেলা হয়েছে? এতোদিন আমরা তাদের সুযোগ দিয়েছিলাম, অবজার্ভ করেছি। কিন্তু এখন আর দেবো না। আমরা কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা প্রতিষ্ঠান চিনি না। মানুষ এবং যানবাহনের যাতায়াত সহজ করতে যা যা করতে হয় করবো। অনেকে আমাদের ফোন করে রিকুয়েস্ট করে, জনপ্রতিনিধিরা আমাদের রিকুয়েস্ট করতেই পারে। যেটা শোনার মতো সেটা আমরা শুনি, আর যেটা অন্যায় আবদার সেটা আমরা আইনগতভাবে আগাই।’
এ ধরনের জনদূর্ভোগ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় একুশে পত্রিকাকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক উত্তর বিভাগের বেশকিছু চমকপ্রদ কাজের কারণে সাধারণ মানুষ বেশ সুফল পাচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র ওই জায়গায় গিয়েই আমাদের থমকে যেতে হয়। আপনারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় পয়েন্টআউট করেছেন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তুলে ধরতে আপনাদের এই প্রচেষ্টাকে আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করি। বিষয়টা আমার নজরে আনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার ফোন করেও বারকোড গ্রুপের সত্তাধিকারী মনজুরুল হককে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ শনিবার বিকেলে বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলে ফিরতি মেসেজে তিনি জানান, ‘আমি খুশি হবো আগামিকাল অথবা পরশুদিন যদি আপনি আর একবার আসেন। ভিড়ের সময়টা আরেকটু দেখে যান, আমিও সেখানে থাকবো।’