সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

গৃহযুদ্ধে মিয়ানমার, অকেজো হয়ে পড়েছে সরকারি প্রশাসন

| প্রকাশিতঃ ২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২:২৪ অপরাহ্ন


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী শান প্রদেশে গত মঙ্গলবার তুমুল লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের কাছে আত্মসমর্পণ করে দেশটির সেনাবাহিনীর এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য। গত দুই মাসে বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে আত্মসমর্পণ করেছে তাতমাদোর (মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম) এমন অনেক ইউনিট। এমনকি পক্ষ পাল্টে সেনাবাহিনী ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেয়ার নজিরও দেখা যাচ্ছে অনেক। গত ২৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ‘অপারেশন ১০২৭’ শীর্ষক তীব্র আক্রমণ অভিযানের মুখে এরই মধ্যে মিয়ানমার ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি জায়গার ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক জান্তা। এসব অঞ্চলে কর্তৃত্ব চলছে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র দলগুলোর। অকেজো হয়ে পড়েছে দেশটির সরকারি প্রশাসন।

সামরিক জান্তা ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ব্যাপক গোলযোগ ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। ধসে পড়েছে অর্থনীতি। একে একে বিদায় নিচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। রিজার্ভ প্রায় নিঃশেষ। গোলযোগপূর্ণ সীমান্তগুলোয় স্থলবাণিজ্য এখন বন্ধ। সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নে ভেঙে পড়েছে মানবাধিকার পরিস্থিতি। অর্থনীতি বা রাজনীতি—কোনো দিক দিয়েই এখন দেশটির চলমান সংকটগুলোর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দেখতে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা বলছেন, চলমান গৃহযুদ্ধ মিয়ানমারকে ক্রমেই ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে ধাবিত করছে।

তাতমাদোর অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলো জোটবদ্ধভাবে একটি প্রবাসী সরকার গঠন করে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) নামে পরিচিত এ সরকার এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থনও আদায় করে নিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো এনইউজিকে মিয়ানমারের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এনইউজিও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় বেশ কয়েকটি দেশে প্রতিনিধিদের দপ্তর খুলেছে।

অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে তাতমাদোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলো এনইউজিকে সমর্থন জানিয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমর্থন আদায় করে নিতে পারলেও এখন পর্যন্ত এনইউজি সেভাবে শক্ত কোনো প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি।

‘‌উই শুড নট ফিয়ার আ রেজিস্ট্যান্স ভিক্টরি ইন মিয়ানমার’ শিরোনামে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশ্লেষক বিলি ফোর্ড ও থিন জার হ্তেৎ বলেন, ‘‌মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়েছে। ব্যাপক এ আক্রমণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এখন নতুন একটি প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। সেটি হলো জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র দল, উৎখাত হওয়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মীদের জোড়াতালির প্লাটফর্মটি যদি জান্তা সরকারকে উৎখাত করতে সক্ষমও হয়, তারা কি আদতে প্রশাসন চালাতে পারবে? নাকি দেশটি আরো বড় নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হবে?’

বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক সাফল্যে মিয়ানমারে সামরিক জান্তা সরকার আর বেশিদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কিনা সে বিষয়ে এরই মধ্যে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন পর্যবেক্ষকরা। গত ২৭ অক্টোবর বামার জাতিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) ও তিনটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক বিদ্রোহী সংগঠন সমন্বিতভাবে আক্রমণ শুরু করলে তাতমাদোর প্রতিরোধ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বর্মি জান্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল চীনের সমর্থনকে। কিন্তু বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণে চীনের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো আপত্তি জানাতে দেখা যায়নি।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে নেপিদোকে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধী কার্যক্রম বন্ধের অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু চীনের সে অনুরোধে তেমন একটা কর্ণপাত করেননি তাতমাদো জেনারেলরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও বেশ অবনতি হচ্ছিল। এতে বর্মি সামরিক জান্তার প্রতি আগের মতো অকুণ্ঠ সমর্থন জানানোর নীতি থেকে সরে এসেছে চীন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড সীমান্তে আনুমানিক ১৬০টি মিলিটারি পোস্ট দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। এনইউজি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামনের দিনগুলোয় এ আক্রমণ আরো তীব্র ও ব্যাপক হবে। জান্তা সরকারের ওপর হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভও অব্যাহত রাখা হবে।

ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে এনইউজির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী দুয়া লাশি লা। তার বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, বিদ্রোহীরা এখন মিয়ানমারের ৬০ শতাংশ ভূমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। মিয়ানমারের আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আহরিত রাজস্বের ৪০ শতাংশই আসে যাত্রী পারাপারের মাধ্যমে। বর্তমানে এটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী নেপিদোর ওপরও আক্রমণ বেড়েছে। এতে করে জান্তা সরকার নাজুক অবস্থানে পড়ে গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ে জাপান টাইমসে গতকাল প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় মতামতে বলা হয়, ‌‘‌পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। কিন্তু মিয়ানমার যেভাবে ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে যাছে, সেটিও কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না। যেসব শক্তি মিয়ানমারকে গণতান্ত্রিক ও সহনশীল চেহারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে, তাদেরকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি একযোগেও কাজ করতে হবে। এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে গোটা বিশ্বকেই।’

শক্ত প্রশাসন দাঁড় করাতে না পারলেও রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিয়তই আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এনইউজি। এতে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন নীতি। দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতিও এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে। প্রবাসী সরকারের সমর্থনে দেশটিতে বিক্ষোভ হচ্ছে নিয়মিতভাবে। এসব বিক্ষোভে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালাচ্ছে জান্তা সরকার। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী ও অন্যান্য নাগরিককে হত্যা করেছে সামরিক জান্তা। একই সঙ্গে তাতমাদোর দমন-পীড়নে বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় দুই লাখ মিয়ানমারবাসী। বাস্তুচ্যুত এসব বর্মি নাগরিকদের সিংহভাগই আশ্রয়ের জন্য গিয়ে জড়ো হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তে।