বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১

চট্টগ্রামের বইমেলার স্থান নিয়ে হতাশা

প্রকাশিতঃ ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ | ৪:১৩ অপরাহ্ন

আবদুল আলী : চট্টগ্রাম নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসংলগ্ন জিমনেশিয়াম চত্বরের খোলা মাঠজুড়ে প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলা জমে ওঠে। আর এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখক-প্রকাশকদের ব্যস্ততা বাড়ে স্বাভাবিকভাবেই। পাঠকরাও মুখিয়ে থাকেন তাদের প্রিয় লেখকদের বই বা নতুন বইয়ের জন্য। একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই হচ্ছে বহু বছর ধরে এই বইমেলা। কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বইমেলা করার জন্য এখনো পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। আগে যাও ছিল তাও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

হঠাৎ করে সিজেকেএস (চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা) সেই জায়গায় কোনো মেলা করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেয়ায় বিপাকে পড়ে সৃজনশীল প্রকাশক, পাঠকসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় চট্টগ্রামে রেলওয়ের কেন্দ্রীয় ভবনের (সিআরবি) সামনের মাঠে এই বইমেলা অনুষ্ঠানের। এদিকে সিআরবি’র এই বইমেলা নিয়ে লেখক, প্রকাশ ও সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে যেন এক ধরনের হাতাশা কাজ করছে।

‘সিআরবিতে এবারের চট্টগ্রামের বইমেলা। মন টানছে না। গতবছরেও কতো আনন্দের সাথে বইমেলায় সময় কাটিয়েছি!’— চট্টগ্রামের বইমেলার ভেন্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এভাবে অনাগ্রহ ও হাতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. আনোয়ারা আলম। বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দেড়টার দিকে নিজের ফেসবুক একাউন্টে এ হাতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

শুধু ড. আনোয়ারা আলমই নন— প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যানুরাগী ও সাংবাদিকরাও ভেন্যুকে যথাযথ মনে করছেন না। এমনকি প্রকাশকরা বই বিক্রি কম হবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

সাহিত্যিক ড. আনোয়ারা আলমের দেয়া ওই স্ট্যাটাসে সাংবাদিক কামাল পারভেজ লিখেছেন, ‘এটা মেরুদণ্ডহীনতার ফল আপা। আমার মনে হয় যারা আয়োজক, বইমেলার প্রতি তাদেরও কোন আবেগ নেই। শুধু করার জন্য করা। না হয়, আগের জায়গায় করা কঠিন কোন বিষয় ছিল না। চেম্বার যদি বাণিজ্য মেলার জন্য তাদের মাঠ ধরে রাখতে পারে, তাহলে বইমেলার জন্য কেন পারলো না? বইমেলাতো কোন বাণিজ্য মেলা নয়, এটা মননের আয়োজন। মেয়র বা তার প্রতিষ্ঠানের কোন আন্তরিকতা নেই বলে বইমেলা অভিভাবকহীন হয়ে সরে যেতে হলো। দুঃখজনক।’— এই কমেন্টে সহমত জানিয়ে সাংবাদিক ও অন্যান্যরা কমেন্ট করেছেন।

কামাল পারভেজের এই কমেন্টের রিপ্লাইয়ে ড. আনোয়ারা আলম লিখেছেন, ‘একেবারে মনের কথা বললেন ভাই কামাল! সৃজনশীলতার চর্চার জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা করতে পারলাম না। খুবই হতাশার।’

মাজহারুল আলম তিতুমির লিখেছেন, ‘আমাদের সকলের ব্যর্থতা বইমেলার কোন স্থানের স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে পারলাম না! আফসোস।’ সেই কমেন্টে আনোয়ারা আলম লিখেছেন, ‘আমাদের ব্যর্থতা!’

জিমনেসিয়াম চত্বরে বইমেলার বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে সিতাংসু কর নামে একজন লিখেছেন, ‘জিমনেসিয়াম মাঠ শুধু বইমেলার জন্যই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। আশপাশে খাবারের দোকান, রেস্টুরেন্ট আছে মনের মতো। এ সুবিধাগুলো কি সব ওখানে আছে!’

সীমা কুন্ডু নামে একজন লিখেছেন, ‘সিআরবির কঠিন অসুখ! এ অসুখ আর সারবার নয়। এরপর ম্যাসিভ অ্যাটাক হবে!’ আনোয়ারুল হক নুরী লিখেছেন, ‘যাদের মন টানে না, ওরাই বইমেলার আয়োজন করে, জায়গায় নির্ধারণ করে। তাই যারা বইপ্রেমী পাঠক তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই।’ অরুণ শীল নামে একজন লিখেন, ‘টানাটানির কারণে আমাদের বইমেলা একদিন তার আকর্ষণ হারাবে।’

এই বইমেলার ভেন্যুকে রাজনীতির বলি হিসেবেও দেখছেন মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নামে একজন। তিনি লিখেন, ‘রাজনীতির ফাঁদে বইমেলাও।’

শাহাদাত হোসাইন নামে আরেকজন লিখেন, ‘প্রচারণায়ও অভাব আছে মনে হচ্ছে! মোড়ে মোড়ে বাণিজ্য মেলার কত মাইকিং! বইমেলা কেন নীরবে!’ শিপন নাথ লিখেন, ‘কত বড় শহর। অথচ, বইমেলার জন্য একটা মাঠ নেই। একটা নির্দিষ্ট জায়গা নেই।’ প্রতিমা দাশ লিখেন, ‘খুব খারাপ লাগে আপা। বইমেলায় জন্য আমাদের শহরে জায়গা নেই।’

নন্দন বইঘরের স্বত্বাধিকারী সুব্রত কান্তি চৌধুরী গণমাধ্যমকে দেয়া এক বক্তব্যে বলেন, ‘সিআরবিতে এবার বইমেলায় পাঠক সমাগম কম হতে পারে। এ স্থানের সবচেয়ে বড় সমস্যা গণপরিবহনের সঙ্গে কানেকটিভিটি কম। তবে প্রত্যাশা করছি সবকিছু সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে।’

এদিকে বইমেলার সার্বিক বিষয় নিয়ে বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বইমেলার জন্য জিমনেসিয়াম মাঠ ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়া এবং স্থায়ী ভেন্যু তৈরির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘বাধ্য হয়ে সিআরবিতে এসেছি। সিআরবি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান। বইমেলা শুধু একটি মেলা নয়। এখানে লেখক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতি কর্মী, শিল্পী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা হয়। নানা কারণে সিআরবিতে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি মনে করি, যদি প্রতিবছর সিআরবিতে করি তাহলে তা হবে আকর্ষণীয়।’

স্থায়ী ভেন্যুর প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘এ জায়গা যদি সিটি করপোরেশনের হত বলতে পারতাম, প্রতি বছর মেলা এখানে হবে। কিন্তু এটা রেলের জায়গা। তবে এটা বইমেলা৷ ভালো উদ্যোগ। আশা করি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর এখানে মেলা করতে দেবে। স্থায়ী মাঠ সিটি করপোরেশনের আছে, কিন্তু দূরে। বাকলিয়াতে আমাদের স্টেডিয়াম আছে। এফআইডিসি মাঠে ১১ একর জমি আছে। কিন্তু দূরবর্তী হওয়ায় সেখানে অনেকে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’

‘সিআরবি এমন এলাকা যা বইমেলার উপযুক্ত। এখানে এলে লেখক ও পাঠকরা খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বই দেখতে পারবেন, আড্ডা দিতে পারবেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে লেখকরা অনুপ্রাণিত হবেন। এটা এমন এলাকা যে, মেলার পরিধি বাড়লেও স্টলের ব্যাপ্তি ঘটাতে পারব বলে বিশ্বাস করি।’— বলেন মেয়র।

এবারের মেলায় মোট স্টল থাকছে ১৫৫টি। স্টল স্থাপনসহ বইমেলার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতি বছরের মতো এবারও বইমেলার আয়োজন করেছে। বইমেলা চলবে ২ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে মেলা।

সিআরবির শিরিষতলা প্রাঙ্গণে ৪৩ হাজার বর্গফুট জায়গায়জুড়ে আয়োজিত বইমেলায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৯২টি প্রকাশনা সংস্থার মোট ১৫৫টি স্টল এতে থাকছে। এর মধ্যে ৭৮টি ডবল স্টল ও সিঙ্গেল স্টল ৭৭টি। এছাড়াও থাকছে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ, বঙ্গবন্ধু কর্নার, লেখক আড্ডাসহ নারী কর্নার ও সেলফি কর্নার।

মেলায় প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হবে। এছাড়া জাতীয় জীবনে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য একুশে সম্মাননা স্মারক পদক ও সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হবে।