সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

তেলের দাম কমছে বিশ্ববাজারে, দেশে বাড়ছে কেন?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ | ৯:৫৩ পূর্বাহ্ন


ভোজ্যতেল নিয়ে দেশে যা চলছে, তা এক কথায় তেলেসমাতি কারবার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতির দিকে, দেশেও আমদানির পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। ঋণপত্র খোলার পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু বাজারে গেলেই ভিন্ন চিত্র। বোতলজাত ভোজ্যতেল পাওয়া যেন সোনার হরিণ! পাওয়া গেলেও দাম আকাশছোঁয়া। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। প্রশ্ন হলো, এত তেল যাচ্ছে কোথায়? কাদের পকেটে ঢুকছে অতিরিক্ত মুনাফা?

সরকার বলছে, বাজারে ভোজ্যতেলের কোনো ঘাটতি নেই। ব্যবসায়ীরাও সুর মেলাচ্ছেন একই সুরে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) বৈঠক, আলোচনা, বিজ্ঞপ্তি—সবই চলছে নিয়মিত। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বাজারে গেলেই বোঝা যায়, সংকট কতটা প্রকট। আসলে সংকটটা যতটা না সরবরাহের, তার চেয়ে বেশি কৃত্রিম। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদার মিলেমিশে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে দায়সারা গোছের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বৈঠক ডাকা হচ্ছে, সেখানে ভাসা ভাসা কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। ব্যবসায়ীরা সেই পুরোনো খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, বোতলের তেল খোলা বাজারে ছেড়ে দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। মাঝখান থেকে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটা যাচ্ছে।

ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর মালিকেরা বলছেন, তাঁরা নিয়মিত সরবরাহ দিচ্ছেন। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ—সবাই দাবি করছে, তাঁরা আগের চেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করছেন। তাহলে বাজারে তেল নেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে আরও অনেক তেলেসমাতি।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, মাঠপর্যায়ে অতিরিক্ত মজুতদারি হচ্ছে। কেউ কেউ আবার বোতলের তেল খোলা বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন। বেশি দামে বিক্রি করছেন। কিন্তু এই অনিয়মগুলো কি সরকারের অজানা? অবশ্যই না। তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য।

সরকারের বাজার তদারকি ব্যবস্থা যে কতটা দুর্বল, তা বাজারে গেলেই বোঝা যায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। লোক দেখানো দু-একটা অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

ভোক্তারা বলছেন, বাজারে ছদ্মবেশে বা ক্রেতা সেজে গেলেই আসল চিত্র বেরিয়ে আসবে। কারা এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তা সহজেই বোঝা যাবে। কিন্তু সেই সৎসাহস কি সরকারের আছে? নাকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো গোপন আঁতাত রয়েছে?

প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভোজ্যতেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। এ কারণে তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো নিজেদের পরিবেশকদের তদারকির কথা বলছে। তারা নাকি নিশ্চিত করবে, ভোক্তারা নির্ধারিত দামে তেল কিনতে পারছেন। কিন্তু বাজারে গেলেই বোঝা যায়, এই তদারকি কতটা লোক দেখানো। আসলে কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

বিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। রমজান মাসে চাহিদা আরও বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান উপলক্ষে পর্যাপ্ত তেল আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাইপলাইনে প্রায় দেড় লাখ টন ভোজ্যতেল ভর্তি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এই তেল বাজারে এসে পৌঁছালেও কি দাম কমবে? নাকি অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে সেই তেলও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে সরকারকে এখনই কঠোর হতে হবে। শুধু বৈঠক আর আলোচনা করে কোনো লাভ হবে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। মজুতদারদের ধরতে হবে।

ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই তেলেসমাতি। সাধারণ মানুষ এর ভুক্তভোগী। তাঁদের কষ্টের কথা কেউ শুনছে না। সরকার যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই সংকট আরও বাড়বে। রমজান মাসে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে।

সরকারকে বুঝতে হবে, ভোজ্যতেল কেবল একটি পণ্য নয়, এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই ভোজ্যতেলের বাজারকে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সরকারকে অবশ্যই এর নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।

ভোজ্যতেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। শুধু নিয়মিত বাজার তদারকি করলেই হবে না, ছদ্মবেশে অভিযান চালাতে হবে। এতে করে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি হাতেনাতে ধরা যাবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের গুদাম খুঁজে বের করে সিলগালা করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।

তৃতীয়ত, আমদানি শুল্ক সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যদি দেখা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে তার প্রভাব পড়ছে না, তাহলে প্রয়োজনে ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক আরও কমিয়ে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে আসবে।

চতুর্থত, টিসিবি-কে সক্রিয় করা জরুরি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-কে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্যে তেল বিক্রি করতে পারে। এতে করে নিম্ন আয়ের মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।

পঞ্চমত, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোজ্যতেলের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় কোথায় কী হচ্ছে, তা পরিষ্কার থাকতে হবে। কোন কোম্পানি কী পরিমাণ তেল আমদানি করছে, বাজারে কত দামে বিক্রি করছে, তার সঠিক হিসাব রাখতে হবে।

সবশেষে, একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে আবারও এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এই পরিকল্পনায় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি নীতির সঠিক সমন্বয়, বাজার তদারকি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

সরকার যদি এই পদক্ষেপগুলো নেয়, তাহলে ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল হবে। সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে তেল কিনতে পারবেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমবে। দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।