
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় তৈরি পোশাক শিল্পকে। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। দেশের প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে আরও অনেক বেশি মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্ভাবনাময় খাতটি নানা সংকটের মুখোমুখি। একের পর এক অস্থিরতা, ষড়যন্ত্র আর আন্তর্জাতিক অপপ্রচারের কারণে গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরেই গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই অস্থিরতা যেন আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিদায়ী সরকারের পলাতক নেতারা এই অস্থিরতার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। গত সাড়ে পাঁচ মাসে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিক অসন্তোষ, অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, লুটপাট, কর্মবিরতি ও চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১ হাজার ১৪৭টি। সামনে রমজান মাস। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সময়ে অস্থিরতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
যে গ্রুপটি এই অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে ‘ভায়োলেন্স ক্রিয়েটার গ্রুপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জানা গেছে, এই গ্রুপটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অবরোধ, মিছিল, জ্বালাও-পোড়াওসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের মূল লক্ষ্য, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া।
শুধু দেশের ভেতরের ষড়যন্ত্র নয়, আন্তর্জাতিক চক্রান্তও গার্মেন্টস শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে নিয়মিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর ফলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে পোশাকের ক্রয়াদেশ প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেছে। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা নিজেদের শ্রমিকদের বন্ধু বলে দাবি করে, তারাও গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নাজুক অবস্থায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে, টাকার মান কমেছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা দেখা দিলে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেবে, রপ্তানি আয় কমে যাবে, এবং দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে বেতন-ভাতা, কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমা হয়ে আছে। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মানা হয় না। এর ফলে শ্রমিকেরা প্রায়ই বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়।
এছাড়া দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানাগুলোতে দুর্বল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিকদের প্রাণহানি ঘটে এবং কারখানার সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
আবার অনেক সময় দেখা যায়, কারখানার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের লোকজন অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করে। তারা শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কারখানার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করে। বহিরাগতদের এমন হস্তক্ষেপের ফলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমরা জানি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব গার্মেন্টস শিল্পের ওপর পড়ে। হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সার্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এছাড়া বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষতি করার জন্য বিদেশি প্রতিযোগী দেশগুলো নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। তারা শ্রমিকদের উসকানি দেয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা চালায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, যাতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বোনাস, কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা – এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। তাদের অভাব-অভিযোগ শুনে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারখানার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের লোকের হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে দমন করতে হবে। যারা ভাঙচুর, লুটপাট চালায়, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
শুধু তাই নয়, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। হরতাল, অবরোধের মতো কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তৎপর হতে হবে। এছাড়া সরকারকে গার্মেন্টস শিল্পের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। শ্রমিক, মালিক, বিদেশি ক্রেতা – সবার স্বার্থ রক্ষা করে এই শিল্পের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শ্রমিক, মালিক, সরকার, রাজনৈতিক দল, আন্তর্জাতিক সংস্থা – সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়বে পুরো দেশের অর্থনীতিতে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কোটি কোটি মানুষ।