
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আর সহিংসতার খবর যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু রাতের অন্ধকার নয়, দিনদুপুরেও মানুষ নিরাপদ নয়। ছিনতাইকারীরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে তারা শুধু মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নিচ্ছে না, মানুষের জীবনও বিপন্ন করে তুলছে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার আতুরার ডিপো এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রকাশ্য দিবালোকে মো. আকাশ নামের এক ব্যবসায়ীকে চাঁদা না দেওয়ায় যেভাবে কোপানো হয়েছে, তা সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। এই নৃশংস ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছেন, যা প্রমাণ করে মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ ও নিরাপত্তাহীন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচলাইশ এলাকার আতুরার ডিপো মার্কেটের ব্যবসায়ী আকাশের কাছে শাহীনের নেতৃত্বে একটি চক্র নিয়মিত চাঁদা দাবি করত। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আকাশকে নির্মমভাবে কোপানো হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত লোকজন থাকলেও, শাহীনের হাতে ধারালো অস্ত্র দেখে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। গুরুতর আহত অবস্থায় আকাশকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আইনের শাসন কতটা দুর্বল।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় রামদা দিয়ে দুই ব্যক্তিকে কোপানোর ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, যাত্রীবাহী বাসে ধর্ষণ, প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। রাতে দূরপাল্লার বাসগুলোতেও যাত্রীদের সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী যেভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার করছে, তাতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলতে গেলে কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘ডেভিল হান্ট’সহ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। কিন্তু, বাস্তবে অপরাধ দমনে এই প্রচেষ্টাগুলো খুব একটা কার্যকর হচ্ছে বলে মনে হয় না। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও অহরহ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে, সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রবাজির পেছনে বিগত জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্র লুটেরাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জেল পালানো ও জামিনে মুক্তি পাওয়া দাগী আসামিরাও পুরনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা অত্যাবশ্যক। জুলাই বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেন পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না, সেই কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পরিধি বাড়াতে হবে। শুধু ঘটনা ঘটার পরেই নয়, বরং অঘটন ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করতে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি হলে, সংশ্লিষ্টদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত কেউ অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে কিনা, কিংবা নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিনা, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা দরকার। সমাজের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সারা দেশে হত্যা, খুনসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আমরা জানি, সামাজিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, জনসচেতনতার অভাব এবং আইনের শাসনের দুর্বলতা – এই সবগুলো বিষয়ই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে দায়ী। সমাজের দ্রুত পরিবর্তনশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে হতাশা, অভাব-অনটন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য; যা অনেককে ঠেলে দিচ্ছে অপরাধের দিকে। একইসাথে, প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ নিয়ে বাড়ছে সাইবার ক্রাইম, অনলাইন প্রতারণা এবং গুজব ছড়ানোর মতো ঘটনা। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা অপরাধ বৃদ্ধিতে ইন্ধন যোগাচ্ছে। এসব প্রতিরোধে যেমন জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি, তেমনি প্রয়োজন আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগ। সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে, তবেই মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং অপরাধ প্রবণতা কমবে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এখনই সময়, সবাই মিলে একসাথে কাজ করে এই সমস্যার সমাধান করা।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।