
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংস্থাটি ঘোষণা করেছে, এপ্রিল মাস থেকে প্রত্যেক রোহিঙ্গার জন্য মাসিক খাদ্য বরাদ্দ ১২.৫ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে প্রায় অর্ধেক করে ৬ ডলারে নামিয়ে আনা হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবং স্থানীয় বাংলাদেশী জনগণের মধ্যে গভীর শঙ্কা ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
ডব্লিউএফপি-র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে তাদের তহবিলে টান পড়েছে, তাই বাধ্য হয়েই এমন অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশ, উভয়ের ওপরেই যে কী মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এই সহায়তার ওপর নির্ভর করেই রোহিঙ্গা পরিবারগুলো কোনোমতে বেঁচেবর্তে আছে। খাবার কম পেলে প্রথমেই অপুষ্টির শিকার হবে শিশুরা। তাদের বাড়ন্ত শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে তারা সহজেই নানারকম অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হবে।
শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ, বিশেষ করে গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও অপুষ্টির শিকার হবেন। এতে করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করলে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে কাজের খোঁজে মরিয়া হয়ে ছুটবে। স্থানীয় বাংলাদেশী শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা থেকে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত, তার ওপর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শ্রমিকের আগমনে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়বে।
অভাবের তাড়নায় রোহিঙ্গারা, বিশেষ করে কিশোর ও যুবকেরা, নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হতে পারে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র চোরাচালান, এমনকি মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধেও তারা জড়িয়ে পড়তে পারে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই এক বিশাল মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের নিজের জনসংখ্যা অনেক বেশি, সম্পদের পরিমাণ সীমিত। তার ওপর এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ভরণপোষণের দায়িত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে এই চাপ আরও বাড়বে, যা বাংলাদেশের জন্য সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি তারা তাদের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। যদিও বলা হচ্ছে যে, জরুরি খাদ্য সহায়তার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না, তবুও অনেকের ধারণা, ডব্লিউএফপি-র এই খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের একটি পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে অন্যান্য দাতা দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করা। কীভাবে এই তহবিলের ঘাটতি পূরণ করা যায়, তার জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ, যেমন – হস্তশিল্প, সবজি চাষ, বা ছোটখাটো ব্যবসার সুযোগ তৈরি করার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই সমস্যার সমাধান কেবল বাংলাদেশের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। ধনী দেশগুলোকে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারাও মানুষ। তাদেরও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
মিয়ানমার সরকারকেও তাদের দায়িত্বের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও আসিয়ানের মতো সংগঠনগুলোকে এক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।
যতদিন রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে না পারছে, ততদিন তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করা আমাদের সকলের কর্তব্য। তাদের ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের একার দায়িত্ব নয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর দায়িত্ব।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। কোনোভাবেই তাদের অনাহারে বা অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য করা যাবে না। এর জন্য যা যা করা দরকার, তাই করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে, প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য দিতে হবে। নইলে, এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে, যার দায়ভার পুরো বিশ্বকেই নিতে হবে।
যদি এখনই এই সমস্যার দিকে নজর দেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি এই অবহেলা ও উদাসীনতা মানব ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।