
রাখাইনের সংঘাত এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো, এই সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস। আরাকান, যা বর্তমানে রাখাইন নামে পরিচিত, একসময় স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোধাপায়া এটি দখল করে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর ব্রিটিশ শাসনকালে আরাকান ব্রিটিশ ভারতের অংশ হয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর আরাকান আবার বার্মার অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন থেকেই আরাকানের স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি (AA) নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির উত্থান এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের স্বায়ত্তশাসন, এমনকি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সামরিক সাফল্য পেয়েছে। রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে এবং তাদের অনেক ঘাঁটি আরাকান আর্মির দখলে চলে গেছে।
এই সংঘাতের ফলে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রথমত, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। রাখাইনে সংঘাত বাড়লে রোহিঙ্গারা বাঁচার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে। আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হিমশিম খেতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সীমান্তে প্রায়ই গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার বাংলাদেশী নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
তৃতীয়ত, রাখাইনের অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কমে গেছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আরাকান আর্মিকে চাঁদা দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চতুর্থত, রাখাইনের এই সংঘাত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চীন রাখাইনে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তারা সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। আরাকান আর্মির উত্থান চীনের এই বিনিয়োগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করছে, জমিজমা কেড়ে নিচ্ছে এবং জোর করে চাঁদা আদায় করছে। অনেকে মনে করেন, আরাকান আর্মির লক্ষ্য হলো রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্ত করা। যদিও আরাকান আর্মি এই অভিযোগ অস্বীকার করে, তবে তাদের কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা বাড়ছে।
রাখাইনে অস্ত্রের বিস্তার একটি বড় উদ্বেগের কারণ। আরাকান আর্মির কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র দখল করেছে। এই অস্ত্র বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
রাখাইনে এখন মানবিক সংকট চলছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অবরোধের কারণে সেখানে খাদ্য, পানীয় জল, ওষুধপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেও মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশ যোগাযোগ রাখছে। বাংলাদেশ চায়, আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক এবং রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরে যাক। তবে আরাকান আর্মি বলছে, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে।
গতকাল শুক্রবার (১৪ মার্চ) জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন। তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের দুর্দশার চিত্র দেখেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অধ্যাপক ইউনূস আশা প্রকাশ করেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে আগামী বছর নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সেজন্য সবাই মিলে চেষ্টা করবেন।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় হলো, একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করা যায়। একইসঙ্গে, মানবিক সহায়তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এলে তাদের আশ্রয় ও খাদ্য দেওয়া যায়। আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন বন্ধে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাখাইনের সংকট কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি একটি আঞ্চলিক সমস্যা। এর সমাধানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।