
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায়টি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান সহিংসতা, ছাত্ররাজনীতির নামে দুর্বৃত্তায়ন এবং অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে একটি জোরালো বার্তা। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি সমগ্র জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ, হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে যখন নিম্ন আদালতের দেওয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হলো, তখন ন্যায়বিচারের দীর্ঘশ্বাস কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক স্ট্যাটাস দেওয়ার জের ধরে আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কক্ষে। সেখানে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়, যার ফলে প্রাণ হারান তিনি। রাত ৩টার দিকে হলের সিঁড়ি থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়। একজন নিরীহ, মেধাবী ছাত্রকে শুধুমাত্র ভিন্নমত প্রকাশের কারণে এভাবে জীবন দিতে হবে, তা ছিল কল্পনাতীত।
আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অসুস্থ রাজনীতির একটি চূড়ান্ত ও ভয়াবহতম রূপ। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর এভাবে প্রাণ হারানো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশিশক্তির রাজনীতি এবং অসহিষ্ণুতা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।
নিম্ন আদালতের রায়ে যখন অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়, তখনও অনেকের মনে শঙ্কা ছিল। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় ছিল অনেকের। তবে, হাইকোর্টের এই রায় প্রমাণ করেছে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই রায় বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে।
এই রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পাশাপাশি আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের অশ্রুসিক্ত চোখগুলো যেন ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার সাক্ষী। আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ্ যে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন, পৃথিবীর কোনো শাস্তিই তার সেই কষ্ট লাঘব করতে পারবে না। তবে, এই রায় হয়তো তাদের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেবে এবং এই বিশ্বাস জোগাবে যে, তার সন্তানের হত্যাকারীরা শাস্তি পেয়েছে।
আবরার হত্যা মামলার রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, র্যাগিং এবং ছাত্ররাজনীতির নামে গুন্ডামির বিরুদ্ধে একটি কঠোর সতর্কবার্তা। এই রায় প্রতিটি ছাত্র, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি শিক্ষা। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, সহিংসতা পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা এবং সর্বোপরি, একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুদায়িত্ব, তা এই রায়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।
কিন্তু, শুধুমাত্র রায় দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষাঙ্গনকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হলে আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। ছাত্ররাজনীতির নামে চলমান দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে, সৃজনশীল চর্চা করতে পারে এবং কোনো রকম ভয় বা হুমকির সম্মুখীন না হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ-স্বাভাবিক ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্রসংগঠনগুলোকে হতে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব, যারা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে, তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে, এবং ক্যাম্পাসে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
একইসঙ্গে, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং পরমতসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। র্যাগিংয়ের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা যেকোনো ধরনের মানসিক সমস্যা বা চাপের মধ্যে থাকলে সাহায্য পেতে পারে।
আবরার ফাহাদের এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো আবরারকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।