
গাজার আকাশ আজ ধোঁয়ায় ঢাকা। বাতাস ভারী হয়ে আছে বারুদের গন্ধে। ইসরাইলের নির্বিচার হামলায় প্রতিদিন রক্তাক্ত হচ্ছে গাজার মাটি। এ যেন এক নরককুণ্ড, যেখানে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য কেবলই সময়ের অপেক্ষা। বিশ্ববাসী দেখছে, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। কতদিন চলবে এই অমানবিকতা?
ইসরাইল বলছে, তারা হামাসকে নির্মূল করতে চায়। কিন্তু হামাসের নামে নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল কিছুই বাদ যাচ্ছে না। গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, আশা, বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই ধ্বংসযজ্ঞের যুক্তি কী হতে পারে?
অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছিল কেবলই একটি প্রহসন। কয়েক দিনের বিরতির পর ইসরাইল যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। গাজার উত্তরাঞ্চলে তারা চালাচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হামলা। বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে, নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে নিরীহ মানুষের ওপর। ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বুলডোজার দিয়ে।
এই হামলায় যারা প্রাণ হারাচ্ছেন, তারা কি শুধুই সংখ্যা? তাদেরও তো পরিবার ছিল, স্বপ্ন ছিল। ১৩০ জন, ৬৩৪ জন—এই সংখ্যাগুলো কেবল সংখ্যা নয়, একেকটি জীবনের গল্প, যা অকালে শেষ হয়ে গেল।
শুধু গাজাতেই নয়, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরও আজ বিপন্ন। সেখানেও ইসরাইল আগ্রাসন চালাচ্ছে। রাতের আঁধারে এসে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হচ্ছে, জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন বসতি স্থাপন করে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জীবন যেন বন্দিশিবিরে। তাদের চলাফেরার কোনো স্বাধীনতা নেই। পদে পদে বাধা, চেকপোস্টের হয়রানি। ইসরাইলি সেনারা যখন তখন যাকে খুশি ধরে নিয়ে যাচ্ছে, অত্যাচার চালাচ্ছে।
গাজার একমাত্র ক্যানসার হাসপাতালটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল অসুস্থ মানুষগুলোর শেষ আশ্রয়স্থল। যেখানে তারা একটুখানি বাঁচার আশা নিয়ে আসত, সেই জায়গাটিও আজ নেই। ইসরাইল বলছে, হামাস সেখানে লুকিয়ে ছিল। কিন্তু এই অজুহাতে একটি হাসপাতালকে কি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়?
আন্তর্জাতিক মহল থেকে নিন্দা জানানো হচ্ছে, প্রতিবাদ করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি ইসরাইলের কিছু যায় আসে? তারা যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাদের বর্বরতা থামানোর মতো কেউ নেই।
বিশ্ববিবেক আজ প্রশ্নবিদ্ধ। গাজার শিশুদের কান্না, মায়েদের আর্তনাদ কি কারো কানে পৌঁছাচ্ছে না? নাকি জেনেও না জানার ভান করে আছে সবাই?
এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে না পারলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। গাজার প্রতিটি ফোঁটা রক্তের দায় নিতে হবে বিশ্ববাসীকে। এখনই সময়, এই বর্বরতা রুখে দাঁড়ানোর।
ইসরাইলের এই আগ্রাসনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। তারা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। গাজাকে তারা বানিয়ে ফেলতে চায় মৃত্যু উপত্যকা।
ফিলিস্তিনিরা আজ নিজভূমে পরবাসী। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। হামাসের রকেট হামলা হয়তো সেই ঘুরে দাঁড়ানোরই একটি মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু এই সংঘাতের সমাধান কি সামরিক পথে সম্ভব?
ইসরাইল যদি ভেবে থাকে, শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদের দমন করা যাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে। ইতিহাস বলে, কোনো জাতিকেই এভাবে দমিয়ে রাখা যায় না। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো বোমায়, কোনো গুলিতে শেষ হবে না।
এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে তারা নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারে।
কিন্তু সেই আলোচনার পরিবেশ কি আদৌ তৈরি হবে? ইসরাইল কি চায় সেই সমাধান? নাকি তারা গাজাকে পুরোপুরি দখল করে নিতে চায়?
বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর যে অন্যায় হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই দায়িত্ব পালন করতে বিশ্বসম্প্রদায় ব্যর্থ হচ্ছে। গাজার মানুষগুলো আজ একা, অসহায়। তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
আমরা কি এভাবেই চেয়ে চেয়ে দেখব? আর কত প্রাণ ঝরলে, আর কত রক্ত ঝরলে আমাদের টনক নড়বে? গাজার এই কান্না কি আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে না?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বন্ধ করা। গাজায় ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করা। আহতদের চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া।
কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন একটি ন্যায্য সমাধান। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, তাদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
নইলে এই সংঘাত চলতেই থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলবে এই রক্তক্ষয়ী খেলা। আর কতদিন এভাবে চলবে? এর শেষ কোথায়?
আমরা চাই শান্তি। আমরা চাই গাজার শিশুরা আবার হাসিমুখে স্কুলে যাক। মায়েরা নিশ্চিন্তে সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ঘুমাক। বাবারা কাজ শেষে ঘরে ফিরুক নিরাপদে। গাজা আবার ভরে উঠুক জীবনের কল্লোলে।
কিন্তু সেই শান্তির জন্য লড়াই করতে হবে। আওয়াজ তুলতে হবে। বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তুলতে হবে। ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে কথা বলতে হবে।
নইলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের সবাইকে দাঁড়াতে হবে। গাজার প্রতিটি ফোঁটা অশ্রু, প্রতিটি ফোঁটা রক্তের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।