সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ: পরনির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এখনই সময়

৬৫ হাজার যক্ষ্মা রোগী চিকিৎসার বাইরে: এখনই ব্যবস্থা না নিলে ছড়াবে সংক্রমণ
নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২৭ মার্চ ২০২৫ | ৪:৩৭ অপরাহ্ন

Tuberculosis patient
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন আর তার জেরে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সাহায্য বিতরণে নতুন নীতির আভাস নিয়ে আলোচনা চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, বিশ্বব্যাপী আমেরিকার বৈদেশিক সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি-এর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের ফলে, তা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমেরিকার এই নীতি পরিবর্তন শুধু কিছু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, বরং বহু মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলার সামর্থ্য রাখে।

ইতোমধ্যেই এই আশঙ্কার কিছু বাস্তব প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। ইউএসএআইডি-এর সহায়তা হ্রাসের সম্ভাবনার খবরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে কর্মরত অনেক কর্মী কাজ হারানোর মুখে পড়েছেন বা কেউ কেউ হয়তো ইতিমধ্যেই বেকার হয়ে গেছেন। এটি কেবল কিছু মানুষের চাকরি হারানোর বিষয় নয়, এর ফলে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি সফল জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির ধারাবাহিকতা হুমকির মুখে পড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের এই অভাব সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজে প্রভাব ফেলছে, যার ফলশ্রুতিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, ইউএসএআইডি-এর সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর তারা সারা দেশে ৩ লক্ষ ১৩ হাজার ৬২৪ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন প্রায় ৩ লক্ষ ৭৯ হাজার মানুষ। এই দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক বিশাল – প্রায় ৬৫ হাজার ৩৭৬ জন। অর্থাৎ, মোট যক্ষ্মা রোগীর প্রায় ১৭ শতাংশই শনাক্তকরণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এই বিশাল সংখ্যক মানুষ নিজেদের অজান্তেই রোগটি বয়ে বেড়াচ্ছেন এবং তাদের পরিবার ও সমাজে নীরবে সংক্রমণ ছড়িয়ে চলেছেন।

এই অশনাক্ত রোগীরা শুধুমাত্র নিজেদের জীবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন না, তারা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিরাট হুমকি তৈরি করছেন। যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ। একজন অশনাক্ত ও চিকিৎসাবিহীন যক্ষ্মা রোগী বছরে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন সুস্থ মানুষের মধ্যে এই রোগের জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে। ৬৫ হাজারের বেশি রোগী যদি শনাক্তের বাইরে থাকেন, তাহলে প্রতি বছর কত লক্ষ মানুষ নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকছেন, তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া, সময়মতো চিকিৎসা শুরু না করলে বা অনিয়মিত চিকিৎসা নিলে সাধারণ যক্ষ্মা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (Drug-Resistant TB) নামে পরিচিত। এর চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং সাফল্যের হারও তুলনামূলকভাবে কম। ইউএসএআইডি-এর সহায়তা বন্ধের ফলে এই ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবী যে সাতটি দেশে একই সঙ্গে সাধারণ যক্ষ্মা এবং ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। এটি আমাদের দেশের জন্য একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। কয়েক দশক ধরে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলার পরও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক সাহায্য কমে গেলে তা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দেবে। বহু বছরের চেষ্টায় অর্জিত সাফল্যগুলো ম্লান হয়ে যেতে পারে এবং যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি আবার আগের মতো খারাপ অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের লড়াইটা শুধু সরকারি প্রচেষ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় আড়াই দশক ধরে ব্র্যাকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও এই কর্মসূচিতে সরকারকে নিরলসভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। এই এনজিওগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-ও তার গবেষণা এবং কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে এই কর্মসূচিতে অবদান রাখছে। ইউএসএআইডি-এর অর্থায়ন মূলত এই বেসরকারি অংশীদারদের কার্যক্রম সচল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত। তাই সাহায্য বন্ধ হওয়ায় এই সংস্থাগুলোর কাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা সামগ্রিক কর্মসূচির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মাকে ‘বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকেই বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য সহযোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিতভাবে কাজ করে আসছে। এই কর্মসূচির অন্যতম বড় সাফল্য হলো, দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্য যক্ষ্মা শনাক্ত করার পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং তাদের চিকিৎসা যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। কারণ যক্ষ্মার চিকিৎসায় সামান্যতম বিচ্যুতি বা অনিয়ম ঘটলে রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা কমে যায় এবং ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা তৈরির ঝুঁকি বাড়ে।

একসময় বাংলাদেশে যক্ষ্মা নিয়ে প্রচুর কুসংস্কার ছিল। সমাজে এই রোগকে অভিশাপ মনে করা হতো। কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে সেই খবর পরিবারের সদস্যরা গোপন রাখতেন, কারণ তারা মনে করতেন ‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষা’। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসার সফলতার কারণে মানুষের সেই ধারণা বদলেছে। মানুষ এখন জানে যে, যক্ষ্মা কোনো অনিরাময়যোগ্য রোগ নয়। নিয়মিত ও সঠিক চিকিৎসা নিলে যক্ষ্মা রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি এই যৌথ উদ্যোগের ফলেই পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু এখন বৈদেশিক সহায়তা বন্ধের ফলে সেই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন যে, বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া না গেলেও যক্ষ্মা নিরোধ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং অর্থের জোগান এতদিন বৈদেশিক সাহায্য এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে আসছিল, তা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলে শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেই শূন্যস্থান পূরণ করা কতটুকু সম্ভব?

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অধ্যাপক আসিফ মাহমুদ মোস্তফা এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, ইউএসএআইডি-এর অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় তার সরাসরি এবং মারাত্মক প্রভাব পড়বে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, সরকারের নিজস্ব যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং জনবল রয়েছে, তার সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় বাজেটে যক্ষ্মা খাতের জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে হবে। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় অর্থায়নে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কারণ ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসা সাধারণ যক্ষ্মার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং এর জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। তবে শুধু চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। পুরো কর্মসূচিটিকেই নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যায়, সেই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি যক্ষ্মা রোগীকে শনাক্ত করার এবং তাদের মানসম্মত চিকিৎসার আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যে ১৭ শতাংশ রোগী শনাক্তের বাইরে থাকছেন, তাদের খুঁজে বের করার জন্য উদ্ভাবনী পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, এনজিও কর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। রোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং দেশের সব প্রান্তে পরীক্ষার সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে। একইসঙ্গে, রোগীদের চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং তাদের পুষ্টি ও অন্যান্য সামাজিক সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবতে হবে।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়ও বটে। এই রোগ দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং দারিদ্র্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কোনো রকম শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। বৈদেশিক সাহায্য আসুক বা না আসুক, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে কোনো অজুহাত বা বিলম্ব কাম্য নয়। সরকারকে এখনই জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। প্রতিটি যক্ষ্মা রোগীর বিনামূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।