সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

নিরাপদ ঈদ: একলা পুলিশের কাজ নয়, দায়িত্ব নিতে হবে সবাইকেই

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২৯ মার্চ ২০২৫ | ১১:৩০ অপরাহ্ন

নজরুল কবির দীপু
ঈদুল ফিতর আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এই উৎসব আনন্দের, মিলনের। সবাই চায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে, নিশ্চিন্তে ঈদ উদযাপন করতে। এই সময়ে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি। খুশির খবর হলো, পুলিশ প্রশাসন ঈদকে সামনে রেখে মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানের নিরাপত্তায় তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে, যা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে যাওয়া বাসাবাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে তারা নজরদারি বাড়াবে। ব্যাংক-বিমা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো এই সময়ে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে, সেগুলোর নিরাপত্তায়ও জোর দেওয়া হবে। বিপণিবিতানগুলোতে কেনাকাটার ভিড় বাড়ে, সেখানেও নিরাপত্তা টহল বাড়ানো ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা একটি নিরাপদ ঈদের জন্য অপরিহার্য।

তবে মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও অনেক করণীয় আছে। একটি শহরের বা এলাকার প্রতিটি কোণে পুলিশের পক্ষে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা যখন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাই বা বেড়াতে যাই, তখন নিজেদের ঘরবাড়ি অরক্ষিত রেখে যাই। মূল্যবান জিনিসপত্র কোথায় কীভাবে রাখা আছে, সে খবর তো আর পুলিশের জানার কথা নয়। তাই নিজেদের সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের নিজেদেরই প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। বাড়ি ছাড়ার আগে দরজা-জানালা ঠিকমতো বন্ধ করা, প্রয়োজনে বিশ্বস্ত প্রতিবেশী বা সোসাইটির নিরাপত্তা প্রহরীকে জানিয়ে যাওয়া, মূল্যবান জিনিস নিরাপদ স্থানে রাখা– এই সাধারণ সতর্কতাগুলো আমাদেরকেই অবলম্বন করতে হবে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নাগরিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং বা স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়, যা খুবই কার্যকর হতে পারে। প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজখবর রাখলে, সন্দেহজনক কিছু দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানালে, অপরাধীরা সহজে সুযোগ নিতে পারে না। নিজেদের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নাগরিকদের সমন্বয় ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। নিরাপত্তা একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি যে সমাজে ছিনতাই, ডাকাতি, চুরির মতো অপরাধের প্রবণতা যেন কিছুটা বেড়েই চলেছে। ঈদের সময় এই অপরাধগুলো আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, কারণ এই সময়ে মানুষের চলাচল বাড়ে, কেনাকাটার জন্য নগদ টাকা হাতে থাকে, আবার অনেক বাড়িঘর ফাঁকা পড়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তাদের আরও বেশি তৎপর ও কৌশলী হতে হবে অপরাধ দমনে।

কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ও হতাশ করে, তা হলো যখন শোনা যায় খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই কিছু বর্তমান বা সাবেক সদস্য নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটা নড়ে যায়। মানুষ তখন কার কাছে নিরাপত্তা চাইবে, কাকে বিশ্বাস করবে? এই ধরনের ঘটনা পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এবং জনগণের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তীব্র করে তোলে। কর্তৃপক্ষের উচিত বাহিনীর ভেতরের এই দুষ্টচক্রকে শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা, যাতে বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও সামনে আসে। অতীতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনাও ঘটেছে। যদিও সরকার তখন সমালোচনাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। পরবর্তীতে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন র‍্যাবের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে, এমনকি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এটি বাতিলের কথাও বলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসেনি। অতীতে পঁচাত্তরের পর জাতীয় রক্ষীবাহিনী ভেঙে দিয়ে সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মতো উদাহরণ আমাদের দেশে রয়েছে। বাহিনীর কাঠামো, কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যা মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থাকে শক্তিশালী করবে।

পুলিশ কর্তৃপক্ষ মহানগরীর বাসিন্দাদের ঈদের ছুটিতে বিশেষভাবে সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছে। আশা করা যায়, শুধু রাজধানী বা বন্দরনগরী নয়, দেশের অন্যান্য বড় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় একই রকম বা প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিরাপত্তা শুধু বাসাবাড়ি বা বিপণিবিতানে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না।

ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সড়কপথে প্রায়ই ছিনতাই বা ডাকাতির খবর পাওয়া যায়। দূরপাল্লার যাত্রায় রাতের বেলা বা নির্জন পথে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। হাইওয়ে পুলিশকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঈদের সময় রাস্তায় যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। এই যানজটের সুযোগ নেয় ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্র। অনেক সময় পরিবহন শ্রমিকদের কারো কারো সাথেও অপরাধীদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ ওঠে। তাই হাইওয়ে পুলিশকে শুধু টহল বাড়ালেই হবে না, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা চৌকির ব্যবস্থা করতে হবে।

জনগণকে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তাদের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও তৎপর থাকতে হবে। ছুটির এই সময়ে তাদের কর্মতৎপরতা মানুষের মনে ভরসা জোগায়। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো, নিয়মিত টহল দেওয়া, অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়ামাত্র দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া– এগুলোই জনগণের প্রত্যাশা।

পরিশেষে বলা যায়, একটি নিরাপদ ও আনন্দময় ঈদ উদযাপন আমাদের সকলেরই কাম্য। এর জন্য প্রয়োজন পুলিশ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং একইসাথে নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সজাগ থাকি, সতর্ক থাকি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতা দিয়ে জনগণের পাশে থাকুক। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারের ঈদ হোক নিরাপদ ও শান্তিময়।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।