সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সিন্ডিকেট ভাঙলেও দেশে বিমানের টিকিট কেন এত দামি?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ৪ এপ্রিল ২০২৫ | ১১:৩০ পূর্বাহ্ন


বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের টিকিট কেনার সময় প্রায়শই যাত্রীদের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। দেখা যায়, একই গন্তব্যের জন্য অন্য কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশে আসার টিকিট যে দামে কেনা যায়, বাংলাদেশ থেকে সেই গন্তব্যে যাওয়ার টিকিট কিনতে গেলে তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনতে হয়। এই বিষয়টি বহু বছর ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে, কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি চোখে পড়ছে না। বিশেষ করে যারা কাজের জন্য বিদেশে যান, সেই প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এটি একটি বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এবং এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ সাধারণত সরকারি কর ও বিভিন্ন চার্জের দিকেই আঙুল তোলে। তাদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ সরকার একটি টিকিটের উপর যে পরিমাণ কর আরোপ করে, তা প্রতিবেশী বা কাছাকাছি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক ধার্যকৃত ট্রাভেল ট্যাক্স বা ভ্রমণ কর এবং আবগারি শুল্ক। এছাড়াও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন) কর্তৃক নির্ধারিত ল্যান্ডিং ও পার্কিং ফি-ও তুলনামূলকভাবে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সাথে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যে মাশুল নেওয়া হয়, সেটিও অতিরিক্ত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।

বিষয়টি কতটা গুরুতর, তা কিছু বাস্তব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়। যেমন, একজন ওমান প্রবাসী সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি চার মাস আগে যখন দেশে এসেছিলেন, তখন সিঙ্গেল টিকিটের দাম পড়েছিল ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন ওমানে ফিরে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে সেই একই রুটের টিকিট কিনতে তার খরচ হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। পার্থক্যটা প্রায় ১২ হাজার টাকা! আরেকজন মালয়েশিয়াগামী যাত্রী জানান, তিনি তিন মাস আগে মালয়েশিয়া থেকে মাত্র এক হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতে (প্রায় ২৫ হাজার টাকায়) টিকিট কেটে দেশে এসেছিলেন। অথচ বাংলাদেশ থেকে ফিরতি টিকিট কিনতে গেলে তার কাছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছিল। উপায় না দেখে তিনি মালয়েশিয়ায় থাকা এক বন্ধুর মাধ্যমে কম দামে টিকিট সংগ্রহ করে কর্মস্থলে ফিরে যান। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এয়ারলাইনস সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিটে সরকার যে পরিমাণ কর ও শুল্ক আদায় করে, তা দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা থেকে বর্তমানে পাঁচটি জনপ্রিয় রুট – সিঙ্গাপুর, দুবাই, ওমান, শারজাহ এবং কুয়ালালামপুর – এর টিকিট কিনলে প্রতিটি টিকিটের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার কর ও শুল্ক বাবদ আদায় করে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা। অথচ একই রুটের জন্য মালয়েশিয়া সরকার কর নেয় মাত্র ২ হাজার ৫৬৮ টাকা, সিঙ্গাপুর নেয় ৫ হাজার ৮৭৮ টাকা, ওমান নেয় ৩ হাজার ৮৭৯ টাকা এবং দুবাই ও শারজাহ নেয় ৪ হাজার ৩৩২ টাকা। হিসাবটা পরিষ্কার – শুধু এই পাঁচটি রুটে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করলেই একজন যাত্রীকে অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রায় ৭ হাজার টাকা বেশি কর দিতে হচ্ছে। এর বাইরে সার্কভুক্ত দেশের জন্য দুই হাজার টাকা এবং অন্যান্য দেশের জন্য চার হাজার টাকা নির্ধারিত ভ্রমণ কর তো রয়েছেই।

উড়োজাহাজ যাত্রায় টিকিটের দাম কমানো এবং এই খাতে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার যে একেবারে চুপচাপ বসে আছে, তা নয়। গত ১১ ফেব্রুয়ারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দশটি নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, টিকিট বুকিং দেওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেটি যাত্রীর নামে বরাদ্দ না করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বুকিং বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়াও, গ্রুপ বুকিংয়ের নামে একসাথে অনেক টিকিট ব্লক করে রাখলে, সাত দিনের মধ্যে যাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বরসহ টিকিট বিক্রির তথ্য নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে টিকিট নিয়ে যে সিন্ডিকেট ব্যবসা চলছিল, তা কিছুটা হলেও ভেঙেছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু মূল সমস্যা, অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত কর ও ফি, আগের মতোই রয়ে গেছে। তাই সিন্ডিকেট ভাঙলেও টিকিটের দাম তেমন একটা কমেনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ মনে করেন, বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। টিকিট বিক্রিতে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারসাজি হয়ে থাকে, তবে আইন প্রয়োগ করে দ্রুত তার সমাধান করা উচিত। তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু কর বা ফি নয়, টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব থাকতে পারে, যা দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

এই অতিরিক্ত দামের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলেন আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা। বাংলাদেশের মোট উড়োজাহাজ যাত্রীর প্রায় ৮০ শতাংশই হলেন এই প্রবাসী কর্মীরা। তারা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেন দেশে পরিবারের কাছে পাঠানোর জন্য। তাদের প্রতিটি টাকাই অত্যন্ত মূল্যবান। বিমানের টিকিটের দাম যদি কম থাকে, তাহলে তাদের কিছুটা সাশ্রয় হয়, যা তাদের পরিবারের কাজে লাগে। কিন্তু টিকিটের দাম বেশি হলে সেই বাড়তি বোঝা তাদেরকেই বহন করতে হয়। এটি তাদের কষ্টার্জিত আয়ের উপর একটি বড় আঘাত।

সরকার হয়তো রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই বিমান টিকিটের উপর এত বেশি কর আরোপ করেছে। কিন্তু এখানে একটি বিপরীত বা প্যারাডক্স তৈরি হয়েছে। যখন যাত্রীরা দেখছেন যে দেশ থেকে টিকিট কিনলে অনেক বেশি টাকা লাগছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথের সন্ধান করছেন। অনেকেই বিদেশ থেকে আসার সময়ই ফিরতি টিকিট কিনে আনছেন অথবা বিদেশের পরিচিতজনের মাধ্যমে টিকিট কিনছেন। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে টিকিট বিক্রি কম হচ্ছে। যদি টিকিট বাংলাদেশ থেকে বিক্রি না হয়, তাহলে সরকার সেই টিকিট থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পাবে কীভাবে? যাত্রীরা সবসময় চেষ্টা করবেন যেখান থেকে সম্ভব কম দামে টিকিট সংগ্রহ করতে। তাই অতিরিক্ত কর আরোপের নীতি শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি কাজটি হলো, আরোপিত কর ও ফি গুলোর হার পুনর্বিবেচনা করা। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর সমপর্যায়ে কর ও ফি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এমন একটি কর কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা যাত্রীদের জন্য সহনীয় হবে এবং একইসাথে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যও পূরণ করবে। টিকিটের দাম যদি যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসে, তাহলে যাত্রীরা দেশ থেকেই টিকিট কিনতে উৎসাহিত হবেন। এতে একদিকে যেমন যাত্রীরা, বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকরা, উপকৃত হবেন, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও স্থিতিশীল ও নিশ্চিত হবে। টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনা এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো অনিয়ম বন্ধ করাও এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। সব মিলিয়ে, একটি সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই দীর্ঘদিনের সমস্যাটির একটি কার্যকর সমাধান দিতে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।