সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

১৮০ হাজার ‘যোগ্য’ রোহিঙ্গা: বাকি ১০-১২ লাখের ভবিষ্যৎ কী?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ৫ এপ্রিল ২০২৫ | ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যাওয়ার যোগ্য। এই সংবাদে খুশি হওয়ার বদলে আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশে বর্তমানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ লাখের কম নয়। শুধুমাত্র উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরেই নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, মিয়ানমারের দেওয়া এই সংখ্যাটি কি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি? বাকি ১০ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গার ভাগ্য কী? তারা কি মিয়ানমারের চোখে ফেরত যাওয়ার যোগ্য নন?

২০১৭ সালে যখন রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা চরমে ওঠে, তখন বাংলাদেশ মানবিকতার এক অভূতপূর্ব নিদর্শন দেখিয়েছিল। সীমান্ত খুলে দিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল লাখ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে। সেই সময় দেশের আপামর জনসাধারণ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল, যদিও কিছু কণ্ঠ তখন এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিল, যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল আবেগের কোলাহলে। আফসোসের বিষয়, আজ সেই স্বাগত জানানো মানুষের একাংশই রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিরক্ত, কেউ কেউ তাদের গালিগালাজ করতেও পিছপা হন না। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক প্রস্তাব শুনে যারা আশায় বুক বাঁধছেন, যারা ভাবছেন এই বুঝি প্রত্যাবাসন শুরু হয়ে গেল, তাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে অনুরোধ করব। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ছয় ধাপে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিল প্রত্যাবাসনের জন্য। ফলাফল? একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমার ফেরত নেয়নি। তারা বারবার আলোচনা করেছে, আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের এই দীর্ঘসূত্রিতা আর টালবাহানা নতুন নয়। এটি তাদের পুরোনো কৌশল। তাই আজ যখন তারা ১ লাখ ৮০ হাজার জনের কথা বলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে – এটা কি আদৌ আন্তরিক কোনো প্রস্তাব, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর আরেকটি অপকৌশল? আগামী ১০ বছরেও এই ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার ফেরা নিশ্চিত কিনা, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে।

তারা যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে “যোগ্য” বলছে, এর মাধ্যমে কি তারা পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছে না যে বাকি ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা তাদের নাগরিক নয় বা ফেরত নেওয়ার যোগ্য নয়? এই বিষয়গুলো অত্যন্ত উদ্বেগের এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ফোরামে এই প্রশ্নগুলো জোরালোভাবে তোলা উচিত। আমাদের দাবি হওয়া উচিত পরিষ্কার – ১ লাখ ৮০ হাজার নয়, প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে সসম্মানে এবং নিরাপদে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই ন্যায়সঙ্গত দাবিতে বাংলাদেশের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো।

উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে আজ এক মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। সাড়ে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গার মধ্যে ৫ লাখই শিশু, যাদের বয়স ৬ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। প্রতি বছর এই শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশু। বাড়ছে বিয়ের সংখ্যাও। একদিকে যেমন প্রত্যাবাসনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, অন্যদিকে প্রতিদিনই বাড়ছে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা। ২০১৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। সেই হিসাবেও ১২ লাখ রোহিঙ্গার ফিরতে সময় লাগার কথা অন্তত ১২ বছর, যদি প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। সাপ্তাহিক ছুটি বা অন্যান্য কারণে বন্ধ থাকলে এই সময় ১৫ বছর ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর যদি দিনে ২০০ জন করে ফেরে, তবে লাগবে প্রায় ২৪ বছর! এর মধ্যে জন্ম নেওয়া নতুন শিশুদের হিসাব করলে এই অঙ্ক আরও জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত সাত বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরেনি। এই অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করতে গিয়ে বাংলাদেশ আজ বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত – প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় জনগণ ভুগছে। এত কিছুর পরও গত এক বছরে আরও প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কারা এর পেছনে? দেশের মানুষ কি নতুন করে আরও রোহিঙ্গা প্রবেশ চেয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি মানবিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকটও বটে। এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল ও হতাশাজনক। শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস হয়তো তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে এই সংকট সমাধানে বিশ্বকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

সময় এসেছে সব ধরনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি জাতীয় ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর। আমাদের একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংকটের গভীরতা বোঝাতে এবং মিয়ানমারের উপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে। আবেগ নয়, বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মিয়ানমারের কোনো ফাঁদে পা দেওয়া চলবে না। প্রতিটি রোহিঙ্গাকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই এই সংকটের একমাত্র সমাধান এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কারণ, দিনশেষে – সবার আগে বাংলাদেশ।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।