সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

পাহাড় রক্ষায় পর্দার আড়ালের যোদ্ধাদের স্যালুট

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২৫ এপ্রিল ২০২৫ | ৬:৫০ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রামের পাহাড় নিধন একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, যা এই শহরের পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং নিরাপত্তাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ‘একুশে পত্রিকা’ জন্মলগ্ন থেকেই চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের পক্ষে, পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় সোচ্চার থাকতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই গত ২০ এপ্রিল আমরা ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের নন্দীরহাট সংলগ্ন মাহমুদাবাদ এলাকায় রাতের আঁধারে চলা ভয়াবহ পাহাড় কাটার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, এই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র জনসমক্ষে এবং প্রশাসনের নজরে এনে একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

আনন্দের বিষয়, আমাদের সেই প্রচেষ্টা একেবারে বিফলে যায়নি। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এবং বিষয়টি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃষ্টিগোচর হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। তবে শুধু সংবাদ প্রকাশই যথেষ্ট ছিল না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজের যে স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রশংসনীয় তৎপরতা আমরা দেখেছি, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর মহাসচিব, আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান এবং তরুণ পরিবেশবিদ মো. ইমতিয়াজ আহমেদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা জানতে পেরেছি, এবং অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান নিজেও আমাকে জানিয়েছেন যে, তাঁরা উভয়ে মিলে প্রশাসনের সাথে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরো অভিযানটি সফল করতে নেপথ্যে কাজ করেছেন। এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে (জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, হাটহাজারীর ইউএনও, এসিল্যান্ড) তা পৌঁছে দেওয়া এবং গভীর রাতে পরিচালিত অভিযানের প্রতি মুহূর্তের ফলোআপ – তাঁদের এই আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া হয়তো তাৎক্ষণিক এই প্রশাসনিক সাড়া পাওয়া কঠিন হতো। ঘটনাস্থল শনাক্তকরণে আমাদের হাটহাজারী প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগের বিষয়টিও অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান উল্লেখ করেছেন, যা একটি সমন্বিত উদ্যোগের চিত্রই তুলে ধরে।

এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম মসিউজ্জামান এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের পরিচালক সোনিয়া সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানটি প্রশংসার দাবিদার। এক্সকেভেটর ও ট্রাক জব্দ করা এবং একজনকে হাতেনাতে ধরে জরিমানা করার মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া গেছে যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না। আমরা একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে এই অভিযানে যুক্ত সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং নেপথ্যে থেকে নিরলস কাজ করে যাওয়া অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান, পরিবেশবিদ মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, আমাদের সহকর্মী মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন ও সাংবাদিক খোরশেদ আলম শিমুল সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

কিন্তু এখানেই আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আমাদের প্রতিবেদনে উঠে আসা মূল হোতা বা সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযানের খবর পেয়ে তাদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, এদের শেকড় আরও গভীরে। প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই অপকর্ম চালানোর যে অভিযোগ স্থানীয়রা করছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এক লক্ষ টাকা জরিমানা এই বিশাল অপরাধযজ্ঞের হোতাদের কতটুকু দমাতে পারবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

‘একুশে পত্রিকা’ বিশ্বাস করে, চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত লড়াই। আমরা সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি এবং তা অব্যাহত রাখব। কিন্তু এর পাশাপাশি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ও মো. ইমতিয়াজ আহমেদের মতো নাগরিকদের সক্রিয়তা, প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত মামলা যেন লোক দেখানো না হয়, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নেপথ্যের কারিগরদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।

আসুন, আমরা সকলে মিলে – গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ – চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত এই পাহাড়গুলোকে রক্ষা করি। শুধু এক রাতের অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি, কঠোর শাস্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য থামাতে। একুশে পত্রিকা এই লড়াইয়ে সর্বদা আপনাদের পাশে থাকবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।