সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

মানবিক করিডর প্রস্তাব: রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না কি আরও জটিলতা?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১ মে ২০২৫ | ১০:৩৩ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আবারও জনপরিসরে ও নীতি নির্ধারকদের আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি মানবিক পথ (করিডর) তৈরির সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন একজন উপদেষ্টার মন্তব্যের পর এই আলোচনা ও বিতর্ক নতুন করে জোর পেয়েছে। উক্ত উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ এই বিষয়ে নীতিগতভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, যা একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিগত কয়েক মাস ধরেই রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা চলছে; এর মধ্যে কখনও আশার ঝলক দেখা গেছে, আবার কখনও বিষয়টি ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছে। এই বছরের মার্চ মাসে কিছুটা ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল যখন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফরে আসেন। সেই সফরে তিনি রমজান মাসে কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করেন এবং সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সাথে ইফতারে অংশ নেন।

ওই সফরের সময়েই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ‘মেহমান’ বা অতিথি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রোহিঙ্গারা পরবর্তী রমজান মাস তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারেই উদযাপন করতে পারবে। তাঁর এই মন্তব্য অনেকের মনে প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছিল।

এর কিছুদিন পর, বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে একটি আলোচনা হয়। সেই আলোচনার পর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে একটি খবর আসে। তারা জানায়, প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে তারা নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। কিন্তু এই খবরেও মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। কারণ, রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। সেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে। এই অবস্থায় আরাকান আর্মিকে বাদ দিয়ে শুধু মিয়ানমারের সরকারের কথায় প্রত্যাবাসন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে এখনই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

এই রকম পরিস্থিতিতেই রাখাইনে মানবিক করিডর তৈরির আলোচনা নতুন বিতর্ক যোগ করে। যদিও পরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই করিডর নিয়ে জাতিসংঘ বা অন্য কারো সঙ্গে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে। মানবিক করিডর তৈরির মূল উদ্দেশ্য বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের ভেতরে থাকা বিপদগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ ও জরুরি সাহায্য পৌঁছানো যাবে।

মানবিক করিডর আসলে কী? জাতিসংঘের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুদ্ধ বা সংঘাত চলছে এমন এলাকায় সাময়িকভাবে সংঘাত থামানোর একটি উপায় হলো মানবিক করিডর। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই এলাকায় কোনো ধরনের হামলা বা সংঘাত চালানো হবে না বলে বিবদমান পক্ষগুলো জাতিসংঘের মাধ্যমে একমত হয়। এর পরের ধাপে, ওই এলাকার বিপন্ন মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় অথবা সেখানে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়।

ইতিহাসে এমন মানবিক করিডরের অনেক উদাহরণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি শিশুদের নিরাপদে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে বসনিয়ার সারায়েভো সংকটের সময়, বা সাম্প্রতিক কালে সিরিয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়েও মানবিক করিডরের ব্যবহার দেখা গেছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত জাতিসংঘ এবং রেড ক্রসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মানবিক করিডরের প্রস্তাবটি নিয়ে যেমন কেউ কেউ আশাবাদী, তেমনি বেশিরভাগ মানুষই বেশ চিন্তিত। কিছু গবেষক মনে করছেন, এই প্রস্তাব মেনে নিলে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা আরও গতি পাবে। যা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এই আশার পাশাপাশি বড় ধরনের শঙ্কাও কাজ করছে। মূল প্রশ্ন হলো, এই মানবিক করিডর কি আসলেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দ্রুত করবে, নাকি আরও পিছিয়ে দেবে? অথবা এর মাধ্যমে কি আরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসবে? এই দ্বিধাটিই সবচেয়ে বড়।

আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে নতুন করে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের ফিরিয়ে দিতে পারছে না। কিন্তু এত বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর চাপ সামলাতেও হিমশিম খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যও আগের চেয়ে কমে গেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিরাট বোঝা তৈরি করেছে।

এই অবস্থায়, মানবিক করিডর কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। কারণ, এর কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো সামনে আসেনি। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, মানবিক করিডরের একটি প্রধান ব্যবহার হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। যদি রাখাইনের রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে সরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে তা অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না।

তখন যদি আরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে হয়, তাহলে বাংলাদেশ কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত? এখনই দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছে। তাদের ব্যবস্থাপনার খরচ বহন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা। বাংলাদেশ কি এই করিডর সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে মনে হয়, সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এমনিতেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই অঞ্চল মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, সহিংসতা এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। একটি মানবিক করিডর কি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে? এই বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

এই মানবিক করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কী লাভ হবে, সে বিষয়েও একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। দেশের স্বার্থ রক্ষা করাটা জরুরি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল বহন করতে হবে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারকে।

জাতিসংঘের মানবিক করিডরের ধারণা পুরোনো হলেও, হুট করে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা নীতি থাকা দরকার ছিল। কিন্তু তেমন কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি অতীতে নেওয়া হয়নি। তাই প্রায়ই জরুরি ভিত্তিতে বা অ্যাডহক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়।

যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, অথবা এই মানবিক করিডর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করে, তাহলে বিকল্প কী হবে? সেই পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি আমাদের এখনই নেওয়া উচিত। তা না হলে, রোহিঙ্গা সংকট আরও গভীর হবে। আর রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশে স্বেচ্ছায় ও সম্মানের সঙ্গে ফিরে যাওয়াটা হয়তো শুধু একটি স্বপ্নেই পরিণত হবে, যা আমাদের এবং রোহিঙ্গা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত হতাশার কারণ হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।