সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

রোহিঙ্গা সংকট: সমাধানের বদলে আরও ঘনীভূত হচ্ছে উদ্বেগ

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ৪ মে ২০২৫ | ৯:৫৭ পূর্বাহ্ন


রোহিঙ্গা সংকট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লঘু হওয়ার পরিবর্তে বরং আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উদ্ভূত এই মানবিক বিপর্যয় এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর শেষ কোথায় বা কীভাবে এর সমাধান সম্ভব, তা যেন এক মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হওয়ায় এই সংকট নতুন মাত্রা লাভ করেছে। দুই পক্ষের সংঘাতের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে, যা দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে।

রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। আরাকান আর্মি, যারা মূলত রাখাইন জনগোষ্ঠীর জাতিগত অধিকার এবং বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছে, তারা জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সংঘর্ষ কেবল রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং পুরো রাজ্যজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর অনেকেও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তবে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে, বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশের দিকেই ছুটে আসছে। একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাব বলছে, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কিন্তু চলমান সংঘাতের তীব্রতা ইঙ্গিত দেয় যে, এই সংখ্যা যেকোনো সময় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান যথার্থই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

এই নতুন অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী সংকট তৈরি করছে। প্রথমত, আশ্রয়স্থলের সংকট। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো ইতিমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের স্থান সংকুলান করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। পুরনো প্রায় ১০ লাখ ৩৬ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার (এবং এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান) মিলিয়ে মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখ ৫১ হাজার ছাড়িয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া, তাদের খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্যসেবা, ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত সংকট। ক্যাম্প স্থাপনের জন্য বনভূমি উজাড় হয়েছে, পাহাড় কাটা হয়েছে, যা স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নতুন অনুপ্রবেশ এই সংকটকে আরও তীব্র করবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সংকট। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ যেকোনো সময় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

এরই মধ্যে নতুন উদ্বেগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে মানবিক করিডর সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি মানবিক উদ্যোগ মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে নানা কৌশলগত এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম যেমনটি বলেছেন, নতুন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং ‘খাদ্য সহায়তা’র নামে মানবিক করিডর চালু করার প্রস্তাবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, এটি কেবল মানবিক সহায়তার পথ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন মিয়ানমার তার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে এই করিডর ব্যবহার করে বিদ্রোহী গোষ্ঠী, অস্ত্র ব্যবসায়ী বা মাদক পাচারকারীদের অনুপ্রবেশের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। করিডরের মাধ্যমে সরবরাহকৃত ত্রাণসামগ্রী কাদের হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও বিলম্বিত করবে এবং তাদের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের কার্যকর আলোচনা ছাড়া একতরফাভাবে এমন করিডরের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য বারবার আবেদন জানিয়ে এসেছে, কিন্তু ফলাফল হতাশাব্যঞ্জক। মিয়ানমার, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা চলমান, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নানা রেজোলিউশন পাশ করেছে – কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বরাবরই অস্পষ্ট এবং গড়িমসিপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে আসছে। রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও তারা নেয়নি। বরং, চলমান সংঘাত সেই পরিবেশকে আরও প্রতিকূল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং মিয়ানমারের প্রতি চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সমর্থন এই সংকট সমাধানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হলেও তাদের ভূমিকা মূলত ত্রাণ সহায়তা এবং মৌখিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুমাত্রিক। প্রথমত, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ইতিমধ্যেই মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে। নতুন অনুপ্রবেশ এবং সম্ভাব্য মানবিক করিডর এই অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর (যেমন আরসা, আরএসও) তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, অপহরণ, চাঁদাবাজি প্রায়ই ঘটছে। এই গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী বিশাল এই জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণরা, সহজেই জঙ্গি ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। চতুর্থত, সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা বজায় রাখা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চোরাচালান, মানব পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধীদের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের পক্ষে একা এই বিশাল বোঝা বহন করা আর সম্ভব নয়। আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু এর সমাধান বাংলাদেশের একক দায়িত্ব হতে পারে না। এর মূল কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই ত্রাণ সহায়তার ঊর্ধ্বে উঠে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করে রাখাইনে একটি নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাসহ ফিরে যেতে পারে। ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি আসিয়ান, ওআইসি এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। চীন, ভারত, জাপানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে মিয়ানমারকে প্রভাবিত করার জন্য আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

মানবিক করিডরের প্রস্তাবটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো পদক্ষেপে সম্মতি দেওয়া উচিত হবে না যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে বিপন্ন করে তোলে। আমাদের পুনর্বার বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে জোরালো আবেদন, এই সংকট থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী এবং ন্যায়সঙ্গত সমাধানই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।