সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

তীব্র গরমে বাড়ছে অপরিণত শিশুর জন্ম, জলবায়ু পরিবর্তনে মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ৯:৩১ পূর্বাহ্ন


রাত গভীর হয়ে আসছিল। চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের বানিয়ারছড়া গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান ঘুরছে না, জানালার বাইরে বাতাসও যেন থমকে আছে। আছিয়া তখন সাড়ে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সারাদিনের গরমে শরীর ছিল ক্লান্ত, অস্থির। তিনি পরে বলেছিলেন, এমন গরম তিনি আগে কখনো দেখেননি। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, পেট শক্ত হয়ে যেত। সেই রাতেই বাথরুমে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন- পানি ভেঙে গেছে, সঙ্গে রক্তক্ষরণ। কুড়ি মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে নেওয়া হলেও ডাক্তার জানান, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহেই সাড়ে তিন মাসের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে।

আছিয়ার গল্প একা নয়। ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্নাও গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ক্লাস করতেন। গরমের দিনে বাসা থেকে ক্যাম্পাসের দীর্ঘ যাতায়াত, যানজট, রোদ, ভিড়, ঘাম, পানিশূন্যতা- সব মিলিয়ে শরীর বারবার ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল তাঁর। শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেন। চিকিৎসক পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তীব্র গরমে নিয়মিত যাতায়াত ও শারীরিক চাপ এই মর্মান্তিক ঘটনার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হতে পারে।

তামান্নার ঘটনাটি এককভাবে তাপপ্রবাহের কারণে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো চিকিৎসা-নথি হাতে নেই। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা একটি বড় সত্যের দিকে আঙুল তুলে দেয়- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি তীব্র হচ্ছে। আর এই চাপ শুধু শ্রমিক, শিশু বা বয়স্কদের ওপর নয়; পড়ছে মাতৃগর্ভের সেই নিঃশব্দ প্রাণটির ওপরও, যার কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই।

সংখ্যার আড়ালে যে ভয়ংকর বাস্তবতা

বাংলাদেশে সমস্যা কতটা গভীর—তা বোঝার জন্য একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও আইসিডিডিআর,বি-তে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে মোট জন্মের ১৬ দশমিক ২ শতাংশ ছিল অপরিণত জন্ম- দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বে সর্বোচ্চ এই হার। প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬০০ শিশু সময়ের আগে জন্ম নেয় এই দেশে- অর্থাৎ দিনে প্রায় ১ হাজার ৩৪০টি, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫৬টি শিশু। এই শিশুদের অনেকেই জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, রক্তস্বল্পতা, শরীরের তাপ ধরে রাখতে না পারা, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিকাশগত জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞায়, ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জন্ম নেওয়া শিশুকেই বলা হয় প্রিম্যাচিউর বা অপরিণত শিশু। ২০২০ সালে বিশ্বে এমন প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছিল, এবং প্রিম্যাচিউর জন্মজনিত জটিলতা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবেই থেকে গেছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অনেক শিশু কেবল উষ্ণতা, বুকের দুধ আর শ্বাসকষ্টের প্রাথমিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই মারা যায়- যেসব মৃত্যুর বড় অংশ আসলে প্রতিরোধযোগ্য।

চকরিয়ার গবেষণা যা বলে দিল

বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ আর মাতৃস্বাস্থ্যের সম্পর্ক বোঝার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত চকরিয়া হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের তথ্য নিয়ে ‘দ্য রিস্ক অব মিসক্যারেজ ইজ অ্যাসোসিয়েটেড উইথ অ্যামবিয়েন্ট টেম্পারেচার: এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ১৩ হাজার ৩৭৬ জন বিবাহিত নারীর দীর্ঘ দশ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এই সময়ে তাঁরা মোট ২৩ হাজার ৪৮২ বার গর্ভধারণ করেন, যার মধ্যে ২ হাজার ৪২২টি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে- যা মোট গর্ভধারণের প্রায় ১১ শতাংশ। বেশিরভাগ গর্ভপাতই ঘটেছে গর্ভধারণের ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া হলো- তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তুলনায় ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে গর্ভপাতের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। গবেষণায় যুক্ত আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী মনজুর আহমেদ হানিফী বলেন, ‘চকরিয়া এলাকায় গ্রীষ্মকালে গর্ভপাতের হার ১২ শতাংশ। শীতকালে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। আর শরৎকালে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। সমুদ্র থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাতের সংখ্যা বেশি। এক্ষেত্রে ২০ বছরের নিচে এবং ৩৫ বছরের ওপরের নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।’

এই গবেষণার আলোকেই বোঝা যায়, কেন চকরিয়ার মতো এলাকায় প্রতিটি গ্রীষ্ম এক ধরনের নিঃশব্দ দুর্যোগ নিয়ে আসে। বিএম চর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের ২০ বছর বয়সী রেহানা—আসল নাম নয়—এই বছরের ৭ এপ্রিল গর্ভপাতের শিকার হন। তিনি বলেন, ‘রোদের তাপ যত বাড়তে থাকে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গরমে অস্থির লাগত। প্রচণ্ড মাথাব্যথা করত। ২৬ মার্চ ব্লিডিং শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে যাই। সেখানকার ডাক্তার বলেন, বাচ্চা ঠিক আছে। আমাকে ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ব্লিডিং বন্ধ হয় না।’ এগারো দিন ওষুধ খেয়েও উন্নতি না হওয়ায় শেষে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে।

শুধু কক্সবাজার নয়, ঢাকার বুকেও একই আতঙ্ক

তাপপ্রবাহের এই থাবা কেবল উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী ঢাকায় গত ২৮ এপ্রিল তাপমাত্রা উঠেছিল ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি হওয়া কল্যাণপুরের মলি তখন ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। অতিরিক্ত গরমে তাঁর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। একদিন আচমকা পানি ভাঙা শুরু হয়। হাসপাতালে চিকিৎসক জানান, পানিশূন্যতার কারণে গর্ভেই সন্তান মারা গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মলি বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে অতিরিক্ত গরমের কারণে শরীর অস্থির লাগত। প্রচণ্ড পানি পিপাসা পেত। পেট শক্ত হয়ে যেত। বুঝতেই পারিনি আমার সন্তান ভালো নেই।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বস্তি এলাকায় অন্তঃসত্ত্বারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রচণ্ড গরমে কাজ করলে বা বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে থাকলে মৃত সন্তান প্রসব ও গর্ভপাতের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

শরীরের ভেতরে আসলে কী ঘটে

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী ব্যাখ্যা করেন, কেন এই ঝুঁকি এত বাস্তব। তিনি বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রা অন্তঃসত্ত্বার শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হলে রক্তের ভারসাম্যহীন প্রবাহ গর্ভের শিশুর পুষ্টি ও অক্সিজেনে ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। পানিশূন্যতা, হরমোন পরিবর্তনের ভারসাম্যহীনতা অকালে প্রসবের সম্ভাব্য সূত্রপাত ঘটায়। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অন্তঃসত্ত্বারা ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারেন না। এতে উচ্চ রক্তচাপ বাড়লে খিঁচুনি দেখা দেয়। সেইসঙ্গে ইনফেকশন, পানিশূন্যতা ইত্যাদি সমস্যাও দেখা দেয়। ফলে গর্ভাবস্থায় সন্তানের মৃত্যু হয়। আবার কখনো কখনো পানি ভেঙে গর্ভে প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম হয়।’ তিনি পরামর্শ দেন, ‘উচ্চ তাপপ্রবাহে অন্তঃসত্ত্বা ও তার গর্ভের সন্তানকে সুস্থ রাখতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। পানিশূন্যতা রোধ করতে পরিমিত স্বাভাবিক পানি পান করতে হবে। ঠান্ডা পানি পান করা যাবে না।’

বিজ্ঞান বলছে, অন্তঃসত্ত্বাদের শরীর সাধারণত ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এর চেয়ে বেশি তাপপ্রবাহ হলেই ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পরিবেশের তাপমাত্রা মায়ের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে বেশি, বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে রক্তপ্রবাহ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে, যাতে গর্ভের শিশুর পুষ্টি ও অক্সিজেনে ঘাটতি তৈরি হয়। আবার গর্ভধারণের পর প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের শরীরের তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়ে।

২০২০ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে (বিএমজে) প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়, উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকা নারীদের অকাল প্রসব এবং মৃত সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা বেশি। প্রতি এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অকাল প্রসবের আশঙ্কা বাড়ে ৫ শতাংশ, আর তাপপ্রবাহের দিনে এই ঝুঁকি স্বাভাবিক দিনের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি হয়ে যায়—ইউনিসেফের তথ্যও একই কথা বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালে সতর্ক করেছে, উচ্চ তাপমাত্রা গর্ভাবস্থার উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, প্রিম্যাচিউর জন্ম ও মৃত সন্তান প্রসবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার: এক বিশেষ ‘হিট হটস্পট’

ক্লাইমেট সেন্ট্রালের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৩৪টি ‘প্রেগন্যান্সি হিট-রিস্ক ডে’ ছিল, যেদিন তাপমাত্রা স্থানীয় ঐতিহাসিক গড়ের ৯৫তম পারসেন্টাইল ছাড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রামকে এই বিশ্লেষণে দেশের অন্যতম বড় ‘টেম্পারেচার হটস্পট’ বলা হয়েছে, যেখানে বছরে গড়ে ৩০টি অতিরিক্ত গর্ভকালীন তাপঝুঁকির দিন যোগ হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়া ও ভূ-প্রাকৃতিক কেন্দ্রের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে শুকনো তাপপ্রবাহের চেয়ে আর্দ্রতাজনিত ‘গুমোট ও ভ্যাপসা গরমের’ ঝুঁকি বেশি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় এখানে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অনুভূত তাপমাত্রা প্রায়শই ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তাঁর কথায়, এই অঞ্চলে বাতাসের আর্দ্রতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ওপরে থাকার কারণে শারীরিক অস্বস্তি বেড়ে যায়, আর চট্টগ্রাম শহরের কংক্রিটের অবকাঠামো ও জলাবদ্ধতার সমস্যা এই অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে।

জীবনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি

উম্মে কুলছুম নামের এক গর্ভবতী নারী জানান, তীব্র গরমে গর্ভবতী ও নতুন মায়েদের শারীরিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও পায়ে ফোলাভাব দেখা দেয়। যাতায়াতে জ্যাম ও ভিড়, বাতাসহীন ঘরে অস্বস্তি এবং পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে চিকিৎসা নেওয়াটাই হয়ে দাঁড়ায় এক চরম চ্যালেঞ্জ। রিকশা বা সিএনজিতে রোদের তাপ আর ধুলোবালি সরাসরি শরীরে এসে লাগে, গণপরিবহনে বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেরই মাথা ঘোরায় বা বমি ভাব হয়। দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা মায়ের রক্তচাপ ও মানসিক চাপের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মালিহা চৌধুরী নামের আরেকজন গর্ভবতী নারী জানান, রান্নাঘরে বা কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এতে মায়ের শরীরের মূল তাপমাত্রা বেড়ে শিশুর ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ক্লান্তি ও দুর্বলতার কারণে নিয়মিত ঘরের কাজ সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে স্তন্যপান করানোর সময় অতিরিক্ত ঘাম আর অস্বস্তি যুক্ত হয় এই কষ্টের তালিকায়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ ইউনিটের প্রকল্প ব্যবস্থাপক (কৈশোরকালীন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য) ডা. মনজুর হোসেন বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বার পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। দিনের বেলা দুই ঘণ্টা এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির কারণে এবং বিদ্যুৎ না থাকলে অন্তঃসত্ত্বারা বিশ্রাম নিতে পারেন না। এতে তারা মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকেন, হতাশাগ্রস্ত থাকেন। এর প্রভাবে কম ওজনের সন্তান জন্ম হতে পারে। ৩৭ থেকে ৪২ সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম না হয়ে প্রিম্যাচিউর ডেলিভারিও হতে পারে।’

নির্দেশিকা আছে, কিন্তু রাস্তায় নেমে আসছে কতটা?

সমস্যাটি সরকার বা উন্নয়ন সহযোগীরা অস্বীকার করছেন না। ২০২৪ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহায়তায় শিশু, গর্ভবতী নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন অন হিট-রিলেটেড ইলনেস’ চালু করে, যার মূলমন্ত্র ‘বি.ই.এ.টি দ্য হিট’- সতর্ক হওয়া, লক্ষণ শনাক্ত করা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুরুতর হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে জনসাধারণকে সতর্ক ও নিরাপদ রাখতে আমরা বিভিন্ন সময়ে নির্দেশিকা জারি করি।’ তাঁর কথায়, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, মাথা ঢেকে রাখা, হালকা সুতির কাপড় পরা, বেশি পানি পান করা, ঘন ঘন গোসল করা এবং বাসি-খোলা খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে শিশু, গর্ভবতী মা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, রিকশাচালক, কৃষক ও দিনমজুরদের কথা- যারা গরমে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।

কিন্তু এখানেই থেকে যায় একটা বড় ফাঁক। গর্ভবতী নারীদের জন্য কার্যকর তাপ সতর্কতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক বিশেষ নিবন্ধন, এসএমএস অ্যালার্ট, গরমে কাজের সময় কমানো, মাতৃসেবা কেন্দ্রে কুলিং কর্নার বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রিম অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুতি—এসব ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জন্মের ফলাফলের সঙ্গে স্থানীয় তাপমাত্রা, পেশা, বাসস্থানের ধরন বা যাতায়াত দূরত্বের সম্পর্ক নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত করা হয় না বলেই দেশে কতজন মা বা শিশু তাপপ্রবাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি ডাটাবেইসও নেই।

শ্রম খাতের অবস্থাও একই রকম অসম্পূর্ণ। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ওমর মো. ইমরুল মহসিন জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ গর্ভবতী শ্রমিকদের জন্য সরাসরি ‘তাপ-সুরক্ষা’ বা হিট স্ট্রেস সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক আইন নেই। তবে আইনে এমন কিছু সাধারণ বিধান আছে যা পরোক্ষভাবে সুরক্ষা দেয়—সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা থাকা কোনো নারী শ্রমিককে শ্রমসাধ্য বা স্বাস্থ্যহানিকর কাজে নিয়োগ করা যায় না, প্রতিটি কারখানায় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক, এবং গর্ভবতী নারী শ্রমিকেরা প্রসবের আগে-পরে মিলিয়ে ১২০ দিন পূর্ণ মজুরিতে ছুটি পাওয়ার আইনগত অধিকারী। নির্দিষ্ট তাপ-সুরক্ষা নীতি না থাকলেও সরকার ও ইউনিসেফ যৌথভাবে ‘বিট দ্য হিট’ গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে- কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে কারখানা মালিকদের সদিচ্ছার ওপর।

যে দেশে প্রতি ঘণ্টায় ৫৬টি শিশু সময়ের আগে জন্মায়

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে নবজাতক মৃত্যু ২০ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু ৩১। এসডিজি অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা নামিয়ে আনতে হবে নবজাতক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ১২-এ এবং শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ২৫-এ। কিন্তু জলবায়ুজনিত তাপঝুঁকি যদি মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল পরিকল্পনায় না আসে, তাহলে এই অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নহরিন আক্তার বলেছিলেন, তীব্র গরম মায়ের গর্ভে ভ্রূণের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশু বাইরের তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। অপরিণত শিশুর জন্য ইনকিউবেটর, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার, শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা ও বিশেষায়িত নবজাতক সেবা জরুরি হলেও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এসব সেবা সব জায়গায় সমানভাবে নেই।

এখন যা করতেই হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন তিন স্তরের ব্যবস্থা। প্রথমত, আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপ সতর্কতা সরাসরি মাতৃস্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে- তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস পেলেই গর্ভবতী নারী, কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবারকল্যাণ সহকারী, ধাত্রী ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, পানির ব্যবস্থা, ছায়া, বায়ু চলাচল ও চিকিৎসা ছুটির সুনির্দিষ্ট বিধান দরকার- বিশেষ করে পোশাকশিল্প, কৃষি, লবণচাষ, গৃহশ্রম ও অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে আইনি বাধ্যবাধকতা এখনো অস্পষ্ট। তৃতীয়ত, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে তাপপ্রবাহ মৌসুমে মাতৃ ও নবজাতক জরুরি প্রস্তুতি থাকতে হবে- কুলিং স্পেস, পর্যাপ্ত স্যালাইন, রেফারেল অ্যাম্বুলেন্স, ইনকিউবেটর ও নবজাতক সেবা।

এটি কেবল স্বাস্থ্যখাতের একক দায় নয়; শ্রম, শিক্ষা, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রশ্ন। শহরে গাছ কমে যাওয়া, কংক্রিটের তাপদ্বীপ, গণপরিবহনের দুর্ভোগ, বস্তির অস্বাস্থ্যকর ঘর, কর্মক্ষেত্রে তাপ সুরক্ষার অভাব এবং দরিদ্র নারীদের চিকিৎসা-অভিগম্যতার সংকট- সব মিলিয়ে তাপপ্রবাহ এখন গর্ভবতী নারীর শরীরের ভেতরে তৈরি করছে এক নতুন, নিরন্তর ঝুঁকি।

তামান্না, আছিয়া, রেহানা বা মলির মতো মায়েদের গল্প তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে কম আলোচিত স্বাস্থ্য-অন্যায়ের প্রতিচ্ছবি। যে দেশে প্রতি ঘণ্টায় ৫৬টি শিশু সময়ের আগে জন্ম নেয়, সেখানে তাপপ্রবাহকে শুধু আবহাওয়ার খবর হিসেবে দেখার আর কোনো সুযোগ নেই। এটি এখন মাতৃগর্ভে শুরু হওয়া এক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা- যার সমাধান খুঁজতে হবে আজই, কাল নয়।