
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে উঠে এসে বিচার প্রশাসনে ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রে বসেছিলেন তিনি। হয়েছিলেন রাজধানীর প্রধান মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম)। কিন্তু সেই চেয়ার আর সম্মান ধরে রাখতে পারলেন না রেজাউল করিম চৌধুরী। আলোচিত ‘গাড়িকাণ্ড’, অবৈধ প্লট গ্রহণ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। একসময়ের প্রভাবশালী এই বিচারকের এমন পতন তার নিজ জেলা চট্টগ্রামেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ সোমবার (১৩ অক্টোবর) এই বরখাস্তের আদেশ প্রকাশ করে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রেজাউল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সাময়িক বরখাস্ত করা যুক্তিযুক্ত মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।”
যেভাবে আলোচনায় আসেন চট্টগ্রামের রেজাউল
রেজাউল করিম চৌধুরীর নাম দেশজুড়ে আলোচনায় আসে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর, একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পর। সেই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যা বিচার বিভাগের স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ছিল ‘গাড়িকাণ্ড’ নিয়ে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়, রেজাউল করিম চৌধুরী একটি মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা গাড়ি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজত থেকে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নিয়েছিলেন। বিচারকের আসনে বসে আলামতের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন।
অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। আইন মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার পূর্বাচলে সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ নেন। বিষয়টি বিশেষভাবে দৃষ্টিকটু ছিল, কারণ সাধারণত হাইকোর্টের বিচারপতিরাও পাঁচ কাঠার প্লট পেয়ে থাকেন।
এর বাইরেও, একটি মামলায় সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি নর্দান ইউনিভার্সিটির পাশে পাঁচ কাঠার একটি রেডিমেড প্লট গ্রহণ করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়।
ঢাকার দায়িত্বে থেকে সীতাকুণ্ডে বাড়িয়েছেন সম্পদ
ঢাকার সিএমএম হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রেজাউল করিম চৌধুরী তার নিজ জেলা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডেও গড়ে তুলেছেন তিনতলা বাড়ি। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নিজ এলাকায় এমন বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন ওঠে তখন। চট্টগ্রামের একজন সন্তানের এমন উত্থান অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার হলেও, তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ জন্ম দিয়েছে হতাশার।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে। এই তদন্তে যদি অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তবে সাময়িক বরখাস্তের বদলে তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তসহ আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। একদা বিচারকের আসনে থাকা চট্টগ্রামের এই সন্তানকে এখন নিজের বিরুদ্ধেই বিচারিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হচ্ছে।