সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

চাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘আ.লীগের ঘনিষ্ঠ’, কমিশনে বিএনপি ঘরানার ৫, জামায়াতের ২

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০৬ পূর্বাহ্ন


অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন রসায়ন বিভাগের সাবেক সভাপতি। তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী বলে মনে না করলেও অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নজিরবিহীন সুবিধা নিয়েছেন। তাঁর কন্যা ও জামাতা দুজনকেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের আমলেই। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগেও তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার করায় আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।

ক্যাম্পাসে অসংখ্য অরাজনৈতিক শিক্ষক থাকলেও এই নির্বাচন কমিশনে প্রকাশ্যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের রাখা হয়েছে। ১২ সদস্যের এই কমিশনে পাঁচজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের কেউ কেউ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া কমিশনে জামায়াতে ইসলামী সমর্থক হিসেবে পরিচিত দুজন শিক্ষকও রয়েছেন।

বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের একজন শিক্ষক এবং একজন বাম রাজনীতি সমর্থক শিক্ষকসহ মোট ১২ সদস্যের নির্বাচন কমিশন এবারের চাকসু নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছে।

চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন এবং সদস্য সচিব হিসেবে অধ্যাপক ড. এ.কে.এম. আরিফুল হক সিদ্দিকী দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ড. মনির উদ্দিনের মেয়ে নওরীন মনির প্রমা ফার্মেসি বিভাগে এবং তার স্বামী রাহী হাসান চৌধুরী জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তারা সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত। তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও এই নিয়োগের পেছনে ড. মনির উদ্দিনের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক শিক্ষকের মতে, ড. মনির উদ্দিন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ না হলে একই অনুষদে তার পরিবারের দুজন সদস্যের চাকরি পাওয়ার সুযোগ ছিল না। আরও অভিযোগ, রসায়ন বিভাগের সভাপতি থাকাকালে তিনি নিজের পছন্দের প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি, পিএইচডিধারী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তার প্রভাবে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল।

এদিকে, অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে অধ্যাপক ড. বেগম ইসমত আরা হক, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মু. জাফর উল্লাহ তালুকদার, অধ্যাপক ড. আমির মুহাম্মদ নসরুল্লাহ, অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ড. রুমানা আক্তার, ড. মো. আনোয়ার হোসেন ও গোলাম হোসেন হাবিব রয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সহ-সভাপতি, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ড. মো. আনোয়ার হোসেন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া অধ্যাপক ড. মু. জাফর উল্লাহ তালুকদার ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আমির মোহাম্মদ নসরুল্লাহ সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত।

কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের সদস্য।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব এ.কে.এম. আরিফুল হক সিদ্দিকী ও নির্বাচন কমিশনার ড. বেগম ইসমত আরা হক জামায়াতপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ড. রুমানা আক্তারকে কেউ কেউ নিরপেক্ষ বললেও কারও মতে তিনি জামায়াত সমর্থক।

এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি রাজনীতি করি না, বুঝিও না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি তা পালন করছি। এ ব্যাপারে আমি মন্তব্য করতে পারব না। কারণ, প্রশাসন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। আমাদের জানানো হয়েছে, কমিশনে দুজন প্রভোস্ট, দুজন ডিন, দুজন বিভাগীয় চেয়ারম্যান, একজন ছাত্র উপদেষ্টা, একজন প্রক্টর এবং কলেজ পরিদর্শক রয়েছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “নির্বাচন কমিশনে যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, আমরা তাদের সবাইকে শপথ করিয়েছি। নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হবে, তা কমিশনে কে আছেন সেটার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কাউকে তো আর নির্বাচন কমিশনে রাখা যাবে না। তাদের ওপর আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে যে, তারা একটি ভালো নির্বাচন উপহার দেবেন।”