সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক তারেক রহমান

জহিরুল ইসলাম (জহির) | প্রকাশিতঃ ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ২:২০ অপরাহ্ন


বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও ত্যাগের প্রসঙ্গ এলে কিছু নাম স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের কথা উঠলে সবার আগে সামনে চলে আসে একটি নাম—যিনি সুদূর লন্ডনে থেকেও অসামান্য নেতৃত্বগুণে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের পতন ত্বরান্বিত করেছেন। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা ও দীর্ঘ নির্বাসন—সবকিছুর ভেতর দিয়েও তিনি আজ বাংলাদেশের মানুষের আশার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, যখন তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে রণাঙ্গনে যুদ্ধরত, তখন মা ও ভাইসহ শিশু তারেক রহমানকেও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী হতে হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কারাবন্দী হওয়া সর্বকনিষ্ঠ বন্দীদের একজন। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার ও কার্ল মার্কসের মতো দার্শনিকদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা গভীরভাবে পাঠ করেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি গৃহবন্দিত্ব এড়িয়ে প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কীভাবে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে, তা সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেন। ফলস্বরূপ, জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে মায়ের সাথে একাধিকবার গৃহবন্দী করে রাখে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে রাজপথে সক্রিয় হন এবং ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। তিনি তৃণমূল থেকে জনগণকে সংগঠিত করে এরশাদ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি মায়ের সাথে সারা দেশে প্রচারণা চালান, যার ফলে বিএনপি নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। চেয়ারপারসনের ছেলে এবং তৃণমূলের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ করেননি; বরং দলের তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন। তাঁর এই সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে দলের স্থায়ী কমিটি তাঁকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করে।

২০০৭ সালে ১/১১-এর পটপরিবর্তনের পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মিথ্যা মামলা, কারাগারের অমানবিক পরিবেশ ও রিমান্ডে নির্মম শারীরিক নির্যাতনে তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সপরিবার লন্ডনে পাড়ি জমান এবং পরে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। সেই থেকে প্রায় ১৭ বছর ধরে তিনি প্রবাসে। কিন্তু দৈহিকভাবে দূরে থাকলেও তিনি রাজনীতি থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হননি। বরং প্রবাসে থেকেও দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার চেষ্টায় অবিচল থেকেছেন। ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে মা বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী হলে তাঁকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি শেখ হাসিনার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে জিয়া পরিবারের ওপর নেমে আসে চরম দমন-পীড়ন। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছিলেন তাদের প্রধান টার্গেট। এমন কোনো ষড়যন্ত্র, অপমান বা মিথ্যা মামলা নেই, যার সম্মুখীন তাঁরা হননি। এত কিছুর পরও তারেক রহমান প্রবাস থেকে বিএনপির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকায় কার্যত পুরো দলের নেতৃত্বের ভার ছিল তাঁর কাঁধে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র-যুব আন্দোলনে তিনি নেপথ্যের রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হন। আন্দোলনকারীরা তাঁর দিকনির্দেশনা অনুসরণ করেই সংগঠিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা ও সাংগঠনিক দক্ষতা থাকলে দূর থেকেও একটি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব।

জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের অনন্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার পেছনে কয়েকটি কারণ সুস্পষ্ট। প্রথমত, দীর্ঘ একদলীয় শাসন ও দমননীতির কারণে দেশে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে বিকল্প হিসেবে জনগণের কাছে তিনিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নাম। দ্বিতীয়ত, তিনি বহন করছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। জনগণ তাঁকে কেবল একজন নেতা নয়, বরং এই পরিবারের নিরলস সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখে। তৃতীয়ত, তাঁর জীবন সংগ্রাম ও ত্যাগে মহিমান্বিত। একের পর এক মিথ্যা মামলা ও নির্বাসন সত্ত্বেও তিনি আপস করেননি। চতুর্থত, তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও তথ্যভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সর্বশেষ, প্রায় দুই দশক দেশের বাইরে থেকেও তিনি বিএনপির মতো একটি বিশাল দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন।

লন্ডনে একটি ছোট কক্ষ, তাকে সাজানো বই, একটি চেয়ার, টেবিলের ওপর ডায়েরি-কলম আর একটি কম্পিউটার—এই সীমিত আয়োজনকে সঙ্গী করেই জনাব তারেক রহমান গত ১৭ বছর ধরে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনি নিয়মিত নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন, দেশের মানুষের সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ছক কষেছেন। জুলাইয়ের শুরুতে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখন তারেক রহমান ছাত্রদলকে এতে সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ ও ওয়াসিমরা শহীদ হওয়ার পর তিনি এক দফার ঘোষণা দেন। আন্দোলনের সময় তিনি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ২৩টি টুইট ও ১৫টি ফেসবুক পোস্ট দেন এবং সাতবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেন।

আন্দোলনের একপর্যায়ে যখন ৯ দফা ও ৮ দফার দোটানায় শিক্ষার্থীরা বিভক্ত, তখন আন্দোলনের হাল ধরেন তারেক রহমান। গত বছরের ২১ জুলাই তিনি ‘এক দফা এক দাবি, খুনি হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগান তুলে ধরেন। আন্দোলনকে বেগবান করতে তিনি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাগ করে দেন। ছাত্রদলের ‘সুপার ফাইভ’ এবং যুবদলসহ অন্যান্য সংগঠনকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করেন। এমনকি ডিবি হেফাজতে সমন্বয়করা থাকাকালীন আন্দোলন যেন ঝিমিয়ে না পড়ে, সে জন্য ঢাকার আশপাশ থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে অবস্থান করান। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী অনেক শিক্ষার্থী ৩ আগস্টের আগে হাসিনার পদত্যাগ চাননি, কিন্তু তারেক রহমান ১ আগস্টেই অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। যার ফলে রাজপথে নেমে আসে বিএনপির লাখো নেতাকর্মী। এই আন্দোলনে বিএনপির চার শতাধিক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যা দলটির ত্যাগের মহিমাই প্রমাণ করে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিনই ছাত্রনেতারা তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ করেন। চার-পাঁচ বছর আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, “দেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে”—তাঁর সেই ভবিষ্যৎবাণীই সত্য হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এটাই বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন। রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে তিনি আগেই ৩১ দফার রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন, যা আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের রোডম্যাপ।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আশা করা হচ্ছে, ডিসেম্বর মাসেই তিনি বীরের বেশে দেশে ফিরবেন। দেশের আপামর জনসাধারণ তাঁকে বরণ করে নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সোমবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ২৩৭ জনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি জানান দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এটি হবে তাঁর প্রথম সংসদ নির্বাচন।

শেখ হাসিনার প্রতিহিংসার কারণে তিনি প্রিয় ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় অংশ নিতে পারেননি, মাকে চোখের দেখা দেখতে পারেননি। নব্য স্বৈরাচার হাসিনা জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করতে সব চেষ্টাই করেছে। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনা আজ ভারতে পলাতক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্ট গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে।

জনাব তারেক রহমান কেবল একজন কঠোর রাজনীতিবিদই নন, তিনি একজন অত্যন্ত মানবিক হৃদয়ের অধিকারী। গত ১ জুলাই ‘গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’ শীর্ষক আলোচনা সভায় গুমের শিকার ছাত্রদল নেতা পারভেজের কিশোরী কন্যা নিধির কান্নাজড়ানো বক্তব্য শুনে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। নিধি যখন প্রশ্ন করেছিল, “আমি আর আমার ভাই কি বাবাকে কোনো দিন জড়িয়ে ধরতে পারব না?”—তখন জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখা গিয়েছিল তারেক রহমান অশ্রুসিক্ত চোখে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মুছছেন। এমন হাজারো মানবিক বেদনার সাক্ষী তিনি।

আজ বাংলাদেশ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। ভাইহারা, নির্বাসিত ও মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েও তারেক রহমান জনগণের হৃদয় থেকে মুছে যাননি; বরং তিনি আজ কোটি মানুষের আস্থার শেষ ঠিকানা। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এই অগ্রনায়ক, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের ৬১তম জন্মদিনে জানাই বিপ্লবী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

লেখক : সাবেক সহ দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।