সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

কুয়ালালামপুর ডায়েরি: গভীর সমুদ্রে অপরাধের সাম্রাজ্য ও সত্যের খোঁজ

শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ৫:৩০ অপরাহ্ন


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: সমুদ্রের বিশাল জলরাশি কেবল বাণিজ্যের পথ নয়, এটি এখন অপরাধের এক বিশাল অভয়ারণ্য। দুর্বল আইন এবং নজরদারির অভাবে সমুদ্র বক্ষে গড়ে উঠেছে মানব পাচারের এক ভয়াবহ নেটওয়ার্ক। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে হাজার হাজার শ্রমিক ভাগ্য বদলানোর আশায় পাড়ি জমান সাগরে, কিন্তু তারা আটকা পড়েন ‘ডার্ক শিপ’ বা অবৈধ জাহাজের আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে।

সেশনের মডারেটর ফেদেরিকো অ্যাকোস্টা রেইনিস আলোচনার শুরুতে জানান, এই অবৈধ কার্যকলাপের জন্য অপরাধীরা শেল কোম্পানি ব্যবহার করে জাহাজের মালিকানা গোপন করে এবং বিভিন্ন দেশের শিথিল আইনের সুযোগ নিয়ে জাহাজের পতাকা পরিবর্তন করে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে তারা জাহাজের পজিশনাল সিস্টেম বা এআইএস বন্ধ করে দেয়, যা ‘ডার্ক ফ্লিট’ নামে পরিচিত। এই জাহাজগুলো প্রায়শই রাশিয়া, ইরান বা চীনের মতো নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শনিবার (২৩ নভেম্বর) সকালে কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারের ৪০৩ নম্বর কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘আনকাভারিং হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যাট সি’ শীর্ষক সেশনে উঠে আসে সাগরের বুকে চলা এই নির্মম অপরাধের চিত্র এবং তা উন্মোচনে সাংবাদিকদের করণীয়। সেশনে নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুড়ি মেলে ধরেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক কেটি ম্যাককুই, আবদুস সোমাদ এবং কনটেক্সট-এর এশিয়া এডিটর অম্রুতা বাইয়াতনাল। সেশনটি সঞ্চালনা করেন পুলিৎজার সেন্টারের ডেটা স্পেশালিস্ট ফেদেরিকো অ্যাকোস্টা রেইনিস।

‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য

বৈশ্বিক নৌ-শিল্পে ‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ বা সুবিধাজনক পতাকার ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মালিকরা সহজেই আইনের চোখ ফাঁকি দিতে পারেন। এর ফলে আইইউইউ (অবৈধ, অননুমোদিত এবং নিয়ন্ত্রণহীন) মাছ ধরা, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পণ্য পাচার এবং ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ট্র্যাকিংয়ের বাইরে থাকা জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে।

বক্তারা জানান, এই অবৈধ জাহাজগুলোতে শ্রমিকদের ঋণের ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়। অনেক সময় তাদের মাঝ সমুদ্রে পরিত্যাগ করা হয়, যেখানে তারা বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদটুকুও পান না। সাংবাদিক কেটি ম্যাককিউ তাঁর অনুসন্ধানে দেখেছেন, মূলত ভারতীয় নাবিকদের ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ইরানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই নাবিকরা চাকরির জন্য দালালদের ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত ফি দেন, অথচ তাদের মাসিক বেতন দেওয়া হয় মাত্র ২০০ ডলার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে তেল পাচার করতে হয়, আর এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্যই নাবিকদের ব্যবহার করা হয়। কেটি জানান, অনেক সময় নাবিকদের পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র বাজেয়াপ্ত করা হয় যাতে তারা পালাতে না পারেন।

সোর্স খোঁজার নতুন কৌশল: লিংকডইন থেকে টিকটক

সাগরের মাঝখানে ঘটা অপরাধের সাক্ষী খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে প্যানেলিস্টরা জানালেন, ডিজিটাল যুগে নাবিকরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে তরুণ নাবিকদের খুঁজে পাওয়ার জন্য টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম অত্যন্ত কার্যকরী মাধ্যম। এ ছাড়া ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে নাবিকরা তাদের নিয়োগকর্তাদের নাম উল্লেখ করেন, যা অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

পেশাদার নাবিক বা মার্চেন্ট সিফেয়ারারদের খুঁজে পাওয়ার জন্য লিংকডইন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোও তথ্যের গোপন খনি হিসেবে কাজ করে। কেটির মতে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো তার জন্য অন্যতম মূল্যবান হাতিয়ার, যেখানে তিনি শত শত পাচার হওয়া নাবিকের সাথে কথা বলতে পারেন। আইএলও-এর নাবিক পরিত্যাগের ডেটাবেস এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের স্যাংশন লিস্ট বা নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ লিড পাওয়া সম্ভব।

সোর্সদের সুরক্ষার বিষয়ে কেটি জোর দেন ‘ট্রমা-ইনফর্মড রিপোর্টিং’ বা ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে তথ্য সংগ্রহের ওপর। তিনি নাবিকদের আগেই জানিয়ে দেন যে তিনি সাংবাদিক, উদ্ধারকারী নন, তবে তিনি তাদের ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ)-এর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন যাতে তারা সহায়তা চাইতে পারেন।

জাহাজের পিছু নেওয়া: প্রযুক্তির ব্যবহার

কোনো সন্দেহভাজন জাহাজের ওপর নজরদারি করার জন্য সাংবাদিকদের হাতে এখন রয়েছে শক্তিশালী সব টুল। ইন্দোনেশিয়ার সাংবাদিক আব্দুস সোমাদ আরাফুরা এবং নাতুনা জলসীমায় অবৈধ মাছ ধরা বা আইইউইউ ফিশিং নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি Rungen05, Rungen03 ও FUF77-এর মতো সন্দেহভাজন জাহাজগুলো ট্র্যাক করতে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন।

সেশনে আলোচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ টুলের মধ্যে রয়েছে:

মেরিন ট্রাফিক (Marine Traffic) ও ইক্যাসিস (Equasis): জাহাজের রিয়েল-টাইম অবস্থান, মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য এবং অতীত ইতিহাস জানার জন্য এই টুলগুলো অপরিহার্য। সোমাদ জানান, জাহাজ মালিকানার ইতিহাস ট্র্যাক করতে ‘অ্যাকুইজ’ (Aquis) একটি চমৎকার উন্মুক্ত উৎস। উদাহরণস্বরূপ, তিনি দেখান যে Rungen03 জাহাজটি চীনের মালিকানাধীন হলেও সেটি রাশিয়ার পতাকা ব্যবহার করছিল।

গ্লোবাল ফিশিং ওয়াচ (Global Fishing Watch): মাছ ধরার জাহাজগুলোর অবৈধ গতিবিধি, মাঝসমুদ্রে পণ্য খালাস (transshipment) বা সন্দেহজনক অবস্থান শনাক্ত করতে এটি ব্যবহার করা হয়।

স্যাটেলাইট ইমেজ: কোপার্নিকাস ব্রাউজার (Copernicus Browser) ব্যবহার করে বিনামূল্যে সাগরের অপটিক্যাল বা রাডার ইমেজ পাওয়া যায়, যা মেঘের আড়ালেও জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। বন্দরে জাহাজের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ট্র্যাক করতে প্ল্যানেট ল্যাব (Planet Lab)-এর হাই-রেজুলেশন ছবি বেশ কার্যকর।

টাকার উৎস ও রাজনৈতিক সংযোগ খোঁজা: ফলো দ্য মানি

মানব পাচার বা অবৈধ বাণিজ্যের মূল হোতাদের ধরতে হলে টাকার প্রবাহ অনুসরণ করা জরুরি। বক্তারা সায়ারি (Sayari), পানজিভা (Panjiva) এবং ওপেনকর্পোরেটস (OpenCorporates)-এর মতো ডেটাবেস ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এগুলোর মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন, কোম্পানির আসল মালিক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রেকর্ড বের করা সম্ভব।

সোমাদ কেবল জাহাজ নয়, জাহাজের ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ’ বা প্রকৃত মালিক এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগও খুঁজে বের করেছেন। তিনি দেখান, কীভাবে একটি বিদেশি জাহাজ (TMP52) ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য ও সামুদ্রিক বিষয়ক মন্ত্রীর কাছ থেকে লাইসেন্স পেয়েছিল, যার নেপথ্যে ছিল স্থানীয় একটি বড় কোম্পানি। জাতিসংঘের কমট্রেড (UN Comtrade) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি-রপ্তানির বার্ষিক হিসাবও মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

সাংবাদিকদের জন্য পরামর্শ

সাগরে অপরাধ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য পুলিৎজার সেন্টারের ‘ওশান রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক’ একটি বড় সুযোগ। ফেদেরিকো জানান, এই নেটওয়ার্ক সাংবাদিকদের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতেই তৈরি করা হয়েছে। সাংবাদিকরা ফেলোশিপের জন্য আবেদন করতে পারেন এবং তাদের নির্দিষ্ট অনুসন্ধানের জন্য গ্রান্ট বা অনুদান পেতে পারেন।

কনটেক্সট-এর এশিয়া এডিটর অম্রুতা বাইয়াতনাল জানান, এই ধরনের সংবেদনশীল রিপোর্ট প্রকাশের আগে তারা কঠোর আইনি পর্যালোচনা বা লিগ্যাল রিভিউ করেন। পাঠকদের আগ্রহ ধরে রাখতে তারা বড় একটি প্রতিবেদনের পাশাপাশি ছোট ছোট গল্পের ধারাবাহিক প্রকাশ (স্লো ড্রিপ) কৌশল ব্যবহার করেন। তিনি আরও জানান, কেটির এই প্রজেক্টটি তাদের ‘ইনক্লুসিভ ইকোনমিকস’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বিভাগের অধীনে করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক অসমতা তুলে ধরে।

কুয়ালালামপুরের এই সেশনটি প্রমাণ করল, সমুদ্রের অপরাধীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সঠিক টুল এবং কৌশলের ব্যবহার জানলে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও সাংবাদিকরা এখন স্যাটেলাইট আর ডেটার মাধ্যমে সাগরের বুকে ঘটা অন্যায়ের সাক্ষী হতে পারছেন।