
বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা ও অমিত তেজ থাকার পরেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছাতে না পারার মূল কারণ এই ব্যাধি। সরকার ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিসরকে ব্যবহার করে দুর্নীতি আজ এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে যে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন তো দূরের কথা, নিত্যদিনের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বছরের পর বছর ধরে লজ্জাজনকভাবে নিচের সারিতেই আটকে আছে। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) প্রকাশিত দুর্নীতি ধারণা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের ঠিক সামান্য ওপরে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের নৈতিক স্খলন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলকে এই দুর্নীতির মহোৎসবের জন্য সিংহভাগ দায়ী করা হয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই ব্যবস্থার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১৫ মাস অতিক্রান্ত হলেও দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে জাতি মুক্তি পায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বোতলে নতুন মদের মতো দুর্নীতির ধরণ ও পাত্র কেবল বদলেছে, কিন্তু ব্যাধিটি রয়ে গেছে আগের মতোই প্রকট। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট—শব্দগুলো এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহার প্রণয়নে টিআইবির সুপারিশ–সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে এক হতাশাজনক চিত্র। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, রাজনৈতিক ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন মহল এখনো দলবাজি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। সবচেয়ে শঙ্কার জায়গাটি হলো, খোদ সরকারের অভ্যন্তরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। যেই সরকারের ওপর মানুষের আস্থা ছিল আকাশচুম্বী, সেই সরকারের ভেতরে যখন দুর্নীতির সংক্রমণ দেখা দেয়, তখন সাধারণ মানুষের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
আমাদের বুঝতে হবে, বিগত সরকার যে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল, তার ভিত্তি ছিল একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীতন্ত্র। রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তাব্যক্তি এবং একশ্রেণিয়ার অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই অশুভ চক্রটি দেশকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন আমাদের চোখের সামনে এক ভয়াবহ লুণ্ঠনের চিত্র তুলে ধরেছে। জানা যাচ্ছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে এই গোষ্ঠীতন্ত্র দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত থাকত, তবে আজ বিনিয়োগে খরা বা কর্মসংস্থানের অভাব হতো না। বর্তমানে আমরা যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জোয়ালে পিষ্ট হচ্ছি, বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে জীবনযাত্রার মান তলানিতে ঠেকেছে—তার পেছনে এই অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতির দায় সবচেয়ে বেশি।
স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা জোরালো অবস্থান নেবে—এমনটাই ভাবা হয়েছিল। মানুষ আশা করেছিল, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পুরোনো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে এবং দখলদারি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হবে। কিন্তু গত ১৫ মাসের চিত্র আমাদের সেই আশার বেলুনে পিন ফুটিয়ে দিয়েছে। বাস্তবে এর কোনোটাই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটেনি। যদিও বিগত সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলের দুর্নীতির তুলনামূলক পরিসংখ্যানগত চিত্র এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি, তথাপি জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে দুর্নীতি দমনে অন্তর্বর্তী সরকার বড়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্প্রতি প্রথম আলো পরিচালিত এক জরিপে জনমতের এই প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষই মনে করেন যে দুর্নীতি দমনে সরকার সফল হতে পারেনি। এই বিশাল অংশের মানুষের নেতিবাচক ধারণা প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে সুশাসনের অভাব কতটা প্রকট। মানুষ যখন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে এখনো হয়রানির শিকার হয়, যখন বাজারে গিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হয়, তখন সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
অবশ্য এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গেড়ে বসেছে, তা কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বা এক দিনেই নির্মূল করা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী লড়াই। কিন্তু সমস্যা হলো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের জোরালো রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং দৃশ্যমান সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন, তার অভাব অত্যন্ত পীড়াদায়ক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। সংস্কার যদি কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জনগণের কোনো উপকারে আসে না।
এর ফলে সাধারণ নাগরিকেরা এখনো সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়ছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজি ও দখলবাজির কারণে পরিবহন থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার—সর্বত্র অরাজকতা বিরাজ করছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে। অন্যদিকে, সরকারের অভ্যন্তরে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন তা তদন্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অনুসরণীয় কোনো দৃষ্টান্তও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি দুর্নীতিবাজদের আরও উৎসাহিত করছে।
সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার প্রস্তুত করছে। এই সন্ধিক্ষণে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা মনে করি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের যে সুযোগ জাতির সামনে এসেছে, তা কাজে লাগাতে হলে অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহার কেবল গালভরা বুলি বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি হলে চলবে না; সেখানে দুর্নীতি দমনের সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ থাকতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই দুর্নীতি দমনের জোরালো অঙ্গীকার করতে হবে এবং তা পালনের মানসিকতা দেখাতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না করলে, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অধরাই থেকে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় হয়তো খুব বেশি নেই, কিন্তু যেটুকু সময় আছে, তার সদ্ব্যবহার করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তত একটি শক্ত প্রতিরোধ দেয়াল তারা গড়ে তুলতে পারে। সেটি না করতে পারলে, ইতিহাসের পাতায় এই সময়টি একটি ‘হারানো সুযোগ’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকরা সেই সুযোগ গ্রহণ করবেন, নাকি পুরোনো পথেই হাঁটবেন।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।