সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বিমানবন্দরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কি কেবল সাধারণ যাত্রীদের হেনস্তা করার জন্য?

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২:৩৫ অপরাহ্ন


বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আমাদের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা, যা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরেই এই প্রতিষ্ঠানটি সেবার নিম্নমান, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে যে ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়, বরং রীতিমতো আতঙ্কের। রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের অন্দরে বসে কীভাবে একটি অসাধু চক্র মানবপাচার ও জালিয়াতির বিশাল জাল বিছিয়েছে, তা দেখে স্তম্ভিত না হয়ে উপায় নেই। প্রশ্ন জাগে, বিমান কি তবে এখন পাচারকারীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে?

সর্ষের ভেতরেই কি তবে ভূতের বসত?

একটি রাষ্ট্রের বিমানবন্দর হলো তার নিরাপত্তার প্রধান প্রবেশদ্বার। শাহজালাল ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে যখন খোদ রাষ্ট্রীয় সংস্থার কর্মীরাই রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হন, তখন নিরাপত্তার প্রশ্নটি আর স্রেফ তাত্ত্বিক থাকে না। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিমান ট্রাফিক শাখার কর্মকর্তা মিজানুর রহমান শিশির এবং চেকিং স্টাফ কৃষ্ণ সুধার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক অনিয়ম নয়। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। সর্ষের ভেতরেই যদি এমন বিশাল ভূতের বসত থাকে, তবে সেই ভূত তাড়াবে কে? মিজানুর রহমান শিশির এবং কৃষ্ণ সুধার মতো কর্মীরা যখন রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে পাচারকারীদের সহযোগী হন, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

নিরাপত্তা কি তবে স্রেফ কাগুজে বাঘ?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে জাল ভিসাধারী যাত্রীদের বিদেশের ‘অ্যাসাইলাম ডেস্কে’ পৌঁছে দেওয়া এবং ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহসিক কাজ তাঁরা অনায়াসেই করে আসছিলেন। এটি কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ। মিজানুর রহমান শিশির ও কৃষ্ণ সুধা যেভাবে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ ও ‘লাগেজ কাটিং’—এর মতো কারবার চালিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি প্রক্রিয়া কতটা ভঙ্গুর। জাল ভিসা নিয়ে একজন যাত্রী যখন সব চেকপয়েন্ট পার হয়ে উড়োজাহাজে উঠে পড়েন, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের ইমিগ্রেশন ও স্ক্যানিং পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে। এই ডিজিটাল যুগেও এমন ম্যানুয়াল বা যোগসাজশমূলক অনিয়ম কীভাবে সম্ভব? নিরাপত্তা যদি কেবল সাধারণ যাত্রীদের হেনস্তা করার জন্য হয়, আর অপরাধীদের জন্য অবারিত দ্বার খুলে দেয়, তবে সেই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সময়ের দাবি।

এই অসাধু চক্রের শিকড় কতটা গভীরে?

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বছর বছর ধরে এই অনিয়ম চললেও মিজানুর রহমান শিশির কিংবা কৃষ্ণ সুধার মতো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বিভিন্ন সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মৌখিক বা ছোটখাটো অভিযোগ উঠলেও তাঁরা কীভাবে বহাল তবিয়তে তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন, তা তদন্তের দাবি রাখে। এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এই অসাধু চক্রটি বিমানবন্দরের অনেক গভীরে তাদের শিকড় গেড়েছে। প্রশাসনিক উর্ধ্বতনদের পরোক্ষ সমর্থন বা উদাসীনতা ছাড়া এমন দীর্ঘমেয়াদী অপরাধ সংঘটন প্রায় অসম্ভব। যখন কোনো অপরাধী গোষ্ঠী জানে যে তারা ধরা পড়লেও রাজনৈতিক প্রভাবে পার পেয়ে যাবে, তখন তাদের স্পর্ধা আকাশচুম্বী হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাবমূর্তি আজ যে সংকটের মুখে, তার পেছনে এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই প্রধান দায়ী।

শুদ্ধি অভিযান কি কেবলই আইওয়াশ?

মন্ত্রণালয় এখন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দৃশ্যত ইতিবাচক মনে হতে পারে। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব তদন্ত কমিটি গঠন বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মিজানুর রহমান শিশির এবং কৃষ্ণ সুধার মতো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় মামলা বা বদলি কোনো সমাধান নয়। এটি একটি রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধের সমতুল্য, কারণ এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এই অপরাধীদের কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক ‘শিশির’ বা ‘কৃষ্ণ সুধা’ তৈরি হবে। লোকদেখানো তদন্ত নয়, বরং অপরাধের মূলে গিয়ে এই সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বিদেশের মাটিতে দেশের সম্মান কি এভাবেই লুট হবে?

বেসামরিক বিমান পরিবহন খাত একটি দেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমানের কর্মীদের মানবপাচারের খবর আসে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং সাধারণ পর্যটকদের ওপর। ইউরোপ বা আমেরিকার বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশি যাত্রীদের বাড়তি তল্লাশি কিংবা সন্দেহের চোখে দেখার মূল কারণ এই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি। মিজানুর রহমান শিশির ও কৃষ্ণ সুধার মতো ব্যক্তিদের লোভের বলি হচ্ছে পুরো জাতি। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থার সুনাম রক্ষা করা কেবল ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ধ্বংসের মুখে পড়বে—এই আশঙ্কা অমূলক নয়।

উত্তরণের পথ কি তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছায়?

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করে যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দরের প্রতিটি কোণায় ডিজিটাল নজরদারি এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম আরও শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে মিজানুর রহমান শিশির বা কৃষ্ণ সুধার মতো কেউ কোনো ফাঁকফোকর খুঁজে না পায়। পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যারা সততার সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের পুরস্কৃত করা এবং যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

বিমানের ডানা থেকে দুর্নীতির এই কালিমা মুছে ফেলতে হলে জিরো টলারেন্স নীতির কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই বিমান তার হারানো গৌরব ফিরে পাক এবং বিদেশের আকাশে মাথা উঁচু করে উড়ুক আমাদের লাল-সবুজ পতাকা। কিন্তু তার আগে মিজানুর রহমান শিশির ও কৃষ্ণ সুধাদের মতো অভ্যন্তরীণ শত্রুদের হাত থেকে এই সংস্থাকে মুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্র কি পারবে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে, নাকি আবারও কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের নিচে ধামাচাপা পড়বে এই ভয়ংকর সত্য?

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।