
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুটা সারা দেশের মানুষের জন্য এক চরম ভোগান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে যখন মানুষের উষ্ণতা প্রয়োজন, ঠিক তখনই রান্নার চুলা থেকে শুরু করে যানবাহনের স্টেশন—সবখানেই চলছে গ্যাসের তীব্র হাহাকার। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, বিশেষ করে রান্না ও যাতায়াত ব্যবস্থা এখন গভীর সংকটে। এই সংকট কেবল প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বোতলজাত বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারেও আগুন লেগেছে। প্রশ্ন হলো, এই দ্বিমুখী সংকটের শেষ কোথায় এবং এর দায় আসলে কার?
জনজীবনের ভোগান্তির চিত্রটি এখন অত্যন্ত করুণ। লাইনে গ্যাস না থাকায় এবং এলপিজি সিলিন্ডারও বাজারে না পাওয়ায় অনেক মানুষকে হোটেল থেকে খাবার এনে খেতে হয়েছে বা হচ্ছে। শেষমেশ বাধ্য হয়ে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনেছেন। এটি কেবল একজন মানুষের গল্প নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের বর্তমান বাস্তবতা। এলপিজির ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় রান্নার কাজে, তাই এই সংকট সরাসরি আঘাত হেনেছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
বাজার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভয়াবহ নৈরাজ্য। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম যেখানে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, সেখানে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, সিলিন্ডার প্রতি প্রায় দ্বিগুণ দাম দিয়েও গ্যাস মিলছে না। ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট এই সংকটের সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই, যা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতারই পরিচায়ক।
এই সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায়, সমস্যাটি বহুমুখী। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এলপিজি আমদানিতে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে পাঁচটি বড় কোম্পানি তাদের এলপিজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। দেশে যেখানে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে দেড় লাখ টন, সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৯০ হাজার টনের মতো। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাজার স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, পাইপলাইনের গ্যাসের অবস্থাও তথৈবচ। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা এবং একের পর এক দুর্ঘটনা রাজধানীবাসীর ভোগান্তি চরমে তুলেছে। গত ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে পাইপলাইন ছিদ্র হওয়ার পর থেকে ঢাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে পাইপলাইনের ভালভ ফেটে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। যদিও তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত ভালভ পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু পাইপলাইনে ঢুকে যাওয়া পানি বের করতে আরও সময় লাগবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতকালীন কারিগরি সমস্যা, যেখানে তাপমাত্রার কারণে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে গ্যাসের এই তীব্র সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অচল করে দিয়েছে।
এই সংকটের নেতিবাচক প্রভাব কেবল রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি আঘাত হেনেছে পরিবহন খাতেও। বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা এবং সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এলপিজি সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব অটো গ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেড় লাখের বেশি এলপিজিচালিত গাড়ির মালিক ও চালক চরম বিপাকে পড়েছেন। জ্বালানি না পেয়ে চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরছেন। দীর্ঘদিন স্টেশন বন্ধ থাকায় মালিকরা কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, সিএনজি স্টেশনগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে ৫ মিনিটের বদলে আধা ঘণ্টা সময় লাগছে, যা স্টেশনের পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানিতে বিঘ্ন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রথমত, আমদানির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত জাহাজ ব্যবহার করে দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি না হয়। ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
গ্যাস সংকট কেবল একটি সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়লে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে, যার প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর। তাই তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে পাইপলাইন মেরামতে আরও দ্রুত ও দক্ষ হতে হবে এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে কঠোর হতে হবে। একইসাথে, এলপিজি আমদানিকারকদের সমস্যা সমাধানে সরকারকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, গ্যাসের এই হাহাকার কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ। রান্নার চুলা জ্বালাতে না পারা বা গাড়ি চালাতে না পারা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই ঘুম ভাঙা উচিত। সংকট সমাধানে কালক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ আর নেই। জনগণ চায় বাস্তব সমাধান, আশ্বাস নয়।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।