
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে জোর প্রচারণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাজধানী থেকে সীমান্ত—সবখানেই প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর জনপদ। তবে ব্যালটের এই লড়াইয়ের ওপর এবার তীক্ষ্ণ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল। স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশায় ঢাকাস্থ বিদেশি মিশন এবং দাতা সংস্থাগুলোও চালিয়ে যাচ্ছে বিরামহীন তৎপরতা।
তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছে বিদেশিরা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঢাকায় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার মিশনপ্রধানরা বৈঠক করেছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটের ফল যে দলের পক্ষেই যাক, নতুন সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝে তার সঙ্গে নিজ দেশের স্বার্থ খাপ খাওয়াতেই বিদেশিদের এই তৎপরতা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, “সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে তার পরিণতি কী হয়, তা বিদেশিরা বুঝতে পেরেছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তার আঁচ তাদের গায়েও লাগে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণেই তারা এবার বেশ তৎপর।”
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা বিবেচনায় আগের মতো অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্থিতিশীলতার সূচনা হতে হবে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই।
প্রচারণায় কৌশলী বার্তা, পর্যবেক্ষকদের নজর
প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিক প্রচারের প্রথম দুই দিন (বৃহস্পতি ও শুক্রবার) সারা দেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। এতে জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে মনে করছেন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) একটি দেশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাগরিক জানান, প্রথম দুই দিনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের জনসভার বক্তব্য তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, “দলগুলোর প্রধানরা প্রচারে ‘একটি ধাঁচ দাঁড় করানোর’ চেষ্টা করছেন। সতর্কতার সঙ্গে কিছু ইস্যু সামনে আনছেন। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর গণভোটের বিষয়টি প্রথম দুদিনের প্রচারে কিছুটা কম এসেছে।”
এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলামের জনসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ওপরও নজর রাখছে বিদেশি মিশনগুলো।
সক্রিয় বিদেশি মিশন, মাঠে ইইউ পর্যবেক্ষক
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি রাষ্ট্র, কানাডা ও সুইজারল্যান্ড থেকে প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ৬৪টি জেলার সবগুলোর ওপর নজর রাখতে শুরু করেছেন তারা।
সম্প্রতি ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে সাতজন মিশনপ্রধান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে সব দলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক চলতি মাসে বিএনপি ও জামায়াত প্রধানদের সঙ্গে দেখা করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি যুক্তরাজ্যের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলামের সঙ্গেও পশ্চিমা কূটনীতিকরা সাক্ষাৎ করেছেন।
নজরে ভারত ও পাকিস্তান
দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তাতে গতি আসবে বলে আশা করছে দিল্লি।
সম্প্রতি ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়া জামায়াতপ্রধান ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গেও ভারতীয় কূটনীতিকরা বৈঠক করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আগামী সরকার গঠন নিয়ে আগ্রহী। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কোন দল ক্ষমতায় আসতে পারে, সে বিষয়ে তারা খোঁজখবর রাখছে বলে জানা গেছে।