
গতকালও যে বাড়িটি ছিল হাসি-খেলায় উৎসবমুখর, আজ সেই বাড়ি নীরব ও নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা আসছেন, দেখছেন শিশু মেজবাহর প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই নিষ্ঠুর নলকূপের গর্তটি। বাবা সাইফুল ইসলাম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তাঁর ছেলের জীবন কেড়ে নেওয়া সেই অন্ধকারের দিকে। কিছুক্ষণ পর সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি প্রিয় পুত্রের স্মৃতি চারণ করতে শুরু করেন। ছেলের এমন অকাল মৃত্যু মেনে নিতে না পেরে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন তিনি।
বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি একজন দিনমজুর। যখন যে কাজ পাই, তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। অভাবের সংসারে একটি কন্যা সন্তানের পর মেজবাহর জন্ম আমাদের ঘর আলোকিত করেছিল। দারিদ্র্যের মধ্যেও মেজবাহকে ঘিরে আমাদের সুখের সীমা ছিল না। গতকাল আমার সব সুখ শেষ হয়ে গিয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বিকেলে আসরের আজানের সময় তিনি ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। তখন তাঁর মেয়ে মীম ও ছোট ভাই মেজবাহ একসাথে খেলছিল। হঠাৎ খবর আসে ছেলে গর্তে পড়ে গিয়েছে। সাইফুল ইসলাম প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলে হয়তো পাহাড়ের টিলা থেকে পড়ে গিয়েছে। কিন্তু এসে দেখেন, নলকূপ বসানোর জন্য খোঁড়া আগের একটি পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে গিয়েছে মেজবাহ। তখনও সে জীবিত ছিল। বাবাকে দেখে আর্তনাদ করে বলেছিল, “বাবা আমাকে তোলো।”
সাইফুল ইসলাম প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় হাতের কাছে যা ছিল তা দিয়েই ছেলেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মেজবাহকে উদ্ধার করা হয়। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শোকাতুর এই পিতা বলেন, “আমি চাই এমন অবহেলায় আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন খালি না হয়।”
নিহত মেজবাহর বোন মীম জানায়, সে ভাইয়ের সাথে খেলছিল। হঠাৎ মেজবাহ গর্তে পড়ে গেলে মীম তাকে ধরার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ সে মীমের আঙুল ধরে ঝুলে ছিল, এরপর নিচে পড়ে গিয়ে কান্না করতে থাকে। মীম চিৎকার করে বাবা-মাকে ডাকতে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কালু জানান, নলকূপ খননের সময় প্রথমে যে স্থানে গর্ত করা হয়েছিল, সেখানে পানি পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পাশে আরেকটি গর্ত করা হয়, কিন্তু আগের গর্তটি ভরাট না করেই ফেলে রাখা হয়। সেই অবহেলার কারণেই আজ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল। গতকাল ভেকু দিয়ে পাশের মাটি সরিয়ে মেজবাহকে উদ্ধার করা হলেও উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত গর্তটিও বর্তমানে উন্মুক্ত অবস্থায় আছে।
এলাকাবাসীর দাবি, অন্য শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে এই মরণফাঁদগুলো ভরাট করা প্রয়োজন।