সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বাস্থ্য খাতে দলগুলোর ‘চটকদার’ প্রতিশ্রুতি, বিশেষজ্ঞরা খুঁজছেন বাস্তবায়ন পরিকল্পনা

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ | ৭:১১ অপরাহ্ন


দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং সেবার মানের বৈষম্যে ধুঁকছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো এই খাত নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কেউ জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলছে, কেউবা প্রতি জেলায় মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলগুলোর প্রতিশ্রুতিতে অবকাঠামো উন্নয়নের কথা থাকলেও টেকসই উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় সব দলই নতুন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ওপর জোর দিচ্ছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিট-২০২৬-এ ঘোষণা করা হয়েছে, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। এছাড়া ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে দলটি।

বিএনপি তাদের ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের রূপরেখা’য় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ (এনএইচএস)-এর আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ চালু, স্বাস্থ্য কার্ড প্রবর্তন এবং ‘বিনা চিকিৎসায় কোনো মৃত্যু নয়’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে দলটি।

জাতীয় ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, ইউনিক হেলথ আইডি, জিপিএস-চালিত অ্যাম্বুলেন্স এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনসিপি।

দলগুলোর এসব প্রতিশ্রুতিকে ‘ইতিবাচক’ বললেও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, “১৮ কোটি মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠন ও মানুষের পকেটের ব্যয় কমানোর বিষয়গুলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্ট নয়। শুধু হাসপাতাল, ডাক্তার ও ওষুধের মধ্যেই স্বাস্থ্যসেবাকে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, অথচ একটি কার্যকর ব্যবস্থার জন্য প্রমোটিভ, প্রিভেন্টিভ, কিউরেটিভ, রিহ্যাবিলিটেটিভ ও প্যালিয়েটিভ—এই পাঁচ স্তম্ভের সমন্বয় জরুরি।”

আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, “বিএনপি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলেছে, যা ইতিবাচক। তবে আগামী দিনে যে সরকারই আসুক, বরাদ্দকৃত অর্থ যেন সঠিকভাবে জনগণের জন্য ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো নয়, গ্রামাঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সের ঘাটতি পূরণ এবং দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের রূপরেখার অভাব রয়েছে দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে।

‘কোনো জেলা মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না’—জামায়াত আমিরের ঘোষণা

উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের কোনো জেলাই মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না। ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জেলাতেও মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে এমনভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করব যেন চিকিৎসার জন্য কাউকে ঢাকায় বা বিদেশে যেতে না হয়। এজন্য আমরা বিভাগীয় শহরগুলোর হাসপাতালকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রূপান্তর করব এবং কমিউনিটি হাসপাতালগুলোকে আরও উন্নত করব।”

দলের পলিসি সামিট-২০২৬-এ বলা হয়েছে, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ নাগরিক এবং ৫ বছরের নিচে শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।

যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালুর প্রতিশ্রুতি বিএনপির

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ (এনএইচএস)-এর আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ চালু করা হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং গ্রামে গ্রামে ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা।

সম্প্রতি এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেন, “সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যাতে সামান্য অসুস্থতায় হাসপাতালের বারান্দায় ভিড় না করে নিজ বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারেন, সেজন্য সারা দেশে গ্রামে গ্রামে ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, এই হেলথ কেয়ারারদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তারা নিয়মিত প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। ফলে ছোটখাটো রোগের জন্য মানুষকে আর কষ্ট করে দূরবর্তী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হবে না।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এ বিষয়ে বলেন, “আমাদের ফোকাসটা ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) থেকে প্রিভেনশনে (প্রতিরোধ) আনতে হবে। আমরা মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবাকে নিয়ে যাব, যাতে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা যায়। এতে মানুষের আর্থিক ব্যয় কমবে এবং হাসপাতালেও ভিড় কমবে।”