
মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে শেষ মুহূর্তে আমন্ত্রণ বাতিল হওয়ার ঘটনায় ভারতে অসহিষ্ণুতা এবং ‘থট পুলিশ’ বা চিন্তা নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান পরিবেশের তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন আচরণের পর তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আর কতদিন এই ঘৃণা পুষে রাখা যাবে? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লেখা এক কলামে তিনি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১ ফেব্রুয়ারি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ আয়োজিত ‘জশনে-ই-উর্দু’ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। নাসিরুদ্দিন শাহ জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার উদ্দেশ্যে তিনি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের ঠিক আগের রাতে অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি তাকে জানানো হয়, সেখানে তার উপস্থিতির আর প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দর্শকদের কাছে মিথ্যা ঘোষণা দেয় যে, নাসিরুদ্দিন শাহ নিজেই অনুষ্ঠানে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
কলামে নাসিরুদ্দিন শাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, সত্য বলার সাহস তাদের ছিল না। সত্যটা হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে আমি নাকি প্রকাশ্যে দেশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেই। যদি সেই কর্মকর্তা কেবল ওপর মহলের নির্দেশ পালন না করে থাকেন এবং সত্যিই ওই বক্তব্যে বিশ্বাস করেন, তবে আমি তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি—আমার এমন একটি বিবৃতি দেখান যেখানে আমি আমার দেশকে ছোট করেছি।
ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (নাম উল্লেখ না করে ‘বিশ্বগুরু’ সম্বোধন করে) কঠোর সমালোচনা করেন এই অভিনেতা। তিনি লেখেন, আমি স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরুর’ প্রশংসা কখনো করিনি। তার আত্মপ্রেম আমাকে পীড়া দেয় এবং গত ১০ বছরে তার করা একটি কাজও আমাকে মুগ্ধ করেনি। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আমি করেছি এবং করে যাব।
নাসিরুদ্দিন শাহ বর্তমান ভারতের করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমাদের দেশে ছাত্রনেতাদের বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়, অথচ সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষক বা খুনিরা ঘন ঘন জামিন পায়। যেখানে গো-রক্ষকদের মানুষ পঙ্গু করা ও হত্যার অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে; যেখানে ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু সংশোধন করা হচ্ছে; যেখানে বিজ্ঞান নিয়ে ছেলেখেলা করা হচ্ছে এবং একজন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত ‘মিয়াদের’ হয়রানি করার কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই ঘৃণা আর কতদিন পুষে রাখা যাবে?
জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই সেই দেশ নয় যেখানে আমি বড় হয়েছি। অরওয়েলের উপন্যাসের সেই ‘থট পুলিশ’ এবং ‘ডাবলস্পিক’ এখন পূর্ণ শক্তিতে মোতায়েন করা হয়েছে। উপন্যাসের সেই ‘দুই মিনিটের ঘৃণা’ এখন বাস্তব জীবনে ২৪ ঘণ্টার ঘৃণায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ‘মহান নেতার’ গুণগান না করাটাকেই এখন রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হয়।
দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেন, অভিনয়ের কোনো শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করে আমি বেশি অর্জন করেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই আচরণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেই মতবিনিময়ের সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন, যা তাকে গভীরভাবোহত করেছে।