সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

চট্টগ্রাম বন্দর অচল: এনসিটি ইজারা নিয়ে ‘গভীর খেলা’, নেপথ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১১:০৪ পূর্বাহ্ন


দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের চিত্রটা আজ রোববার সকাল থেকে ভিন্ন। জেটিতে ক্রেনের ঘড়ঘড় শব্দ নেই, ট্রেইলারের হর্ন নেই, কনটেইনার ওঠানামার চিরচেনা ব্যস্ততাও উধাও। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বন্দর আজ কার্যত অচল।

তবে এবারের ধর্মঘট নিছক দাবি আদায়ের আন্দোলন নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসন ও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অবিশ্বাস, ‘ডাবল গেম’ খেলার অভিযোগ এবং দেশের স্বার্থ বনাম বিদেশি বিনিয়োগের জটিল সমীকরণ। রোববার সকাল ৮টা থেকে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের এই ধর্মঘটে প্রথমবারের মতো বন্দরের বহির্নোঙরের (আউটার অ্যাঙ্করেজ) কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

বিশ্বাসের ঘরে ফাটল: নেপথ্যে ‘ডাবল গেম’?

গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর শ্রমিক নেতারা কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন। তাহলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কেন আবার কঠোর আন্দোলনে নামলেন তাঁরা?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না’ বলে আশ্বস্ত করা হলেও, ঠিক ওই দিন বিকেলেই বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) একটি চিঠি পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সিপিএ চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে ১৫ জন আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতার সম্পদের হিসাব তলব এবং তাঁদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ জানানো হয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এটি প্রশাসনের স্পষ্ট ‘দ্বিমুখী আচরণ’। মুখে আলোচনার কথা বলে ভেতরে-ভেতরে শ্রমিক নেতাদের কোণঠাসা করার এই কৌশলই মূলত বারুদে আগুন দিয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘উপদেষ্টা আমাদের কথা দিলেন, আর চেয়ারম্যান আমাদের পেছনে ছুরি মারলেন। এটা স্পষ্ট যে, বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান বিগত স্বৈরাচারী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। তিনি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই অস্থিরতা জিইয়ে রাখছেন।’

এনসিটি ইজারা: জাতীয় স্বার্থ নাকি অন্য কিছু?

এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও লাভজনক টার্মিনাল। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় অপারেটররা এটি পরিচালনা করে আসলেও হঠাৎ করে কেন ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এটি ইজারা দেওয়ার তোড়জোড়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, এটি লাভজনক রাষ্ট্রীয় স্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এই কাজ দিতে চেয়েছিল, তখন শ্রমিকদের ২৩ লাখ টাকা করে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ দিয়ে বিদায় করার পরিকল্পনা ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই একই ‘পুরনো ফাইল’ কেন নড়াচড়া করছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এনসিটি বিদেশি কোম্পানির হাতে গেলে বন্দরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তো রয়েছেই।

মাঠের চিত্র: আতঙ্ক আর গ্রেপ্তার

রোববার সকাল থেকে বন্দরের পরিস্থিতি থমথমে। এনসিটি, সিসিটি (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল) ও জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ)—সবখানেই কাজ বন্ধ। বন্দরের ভেতরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

আন্দোলন দমাতে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, শামসু মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ নামের সংগ্রাম পরিষদের দুই নেতাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংস্থা আটকের কথা স্বীকার করেনি। ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘আমাদের নেতাদের তুলে নিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না। গ্রেপ্তার যত বাড়বে, আন্দোলন তত তীব্র হবে।’

অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ

বন্দরের এই অচলাবস্থা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের টুঁটি চেপে ধরেছে। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার ইয়ার্ডে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৩১২টি কনটেইনার জমে আছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এবার বহির্নোঙরেও পণ্য খালাস বন্ধ। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশই হয়। ফলে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আটকে যাচ্ছে, রপ্তানি পণ্য ডিপোতে পড়ে আছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘এনসিটি একদিন বন্ধ থাকলে ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কিন্তু বহির্নোঙর বন্ধ থাকা মানে পুরো সাপ্লাই চেইন ধসে পড়া। বিদেশি বায়ারদের কাছে একটি বাজে বার্তা যাচ্ছে, যা টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা অসম্ভব। অনেক রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়ে যেতে পারে।’

কর্তৃপক্ষের ‘বিভাজন’ কৌশল?

সংকট নিরসনে আজ রোববার সকালে বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বিভিন্ন বিভাগের ২০০ কর্মকর্তা ও ১০০ শ্রমিককে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। কিন্তু আন্দোলনকারী মূল নেতাদের বাদ দিয়ে এই বৈঠক ডাকার বিষয়টিকে ‘বিভাজন ও শাসন’ কৌশল হিসেবে দেখছেন শ্রমিকরা। ফলে তাঁরা এই বৈঠক বর্জন করেছেন।

বন্দর সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান মহোদয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। আমরা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চাই।’

তবে শ্রমিকদের ৪ দফা দাবি (ডিপি ওয়ার্ল্ডের ইজারা বাতিল, চেয়ারম্যানের অপসারণ, মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার) না মানা পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান এই অর্থনৈতিক দ্বারে এমন তালা ঝুলে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।