
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইন প্রণেতাদের মধ্যে এবারও ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫৮ শতাংশই পেশায় ব্যবসায়ী। পাশাপাশি নতুন এই সংসদের ৮৩ শতাংশ সদস্য উচ্চশিক্ষিত হলেও বয়সের দিক থেকে নবীনদের উপস্থিতি কম; নির্বাচিতদের ৭৩ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি।
গত বৃহস্পতিবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট বাতিল হয়েছে। এছাড়া ঋণ খেলাপের দায়ে বিজয়ী দুই বিএনপি প্রার্থীর ফল প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ২৯৭ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৮ সাল থেকে প্রার্থীদের হলফনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৯৭ জন বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে ১৭৪ জনই নিজেদের পেশা হিসেবে ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ একাধিক পেশার কথা জানালেও প্রধান পেশা হিসেবে ব্যবসাই উঠে এসেছে।
এককভাবে ২০৯টি আসন পাওয়া বিএনপির ১৪৫ জন সাংসদই ব্যবসায়ী, যা দলটির মোট বিজয়ীর ৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন বিজয়ীর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী (২৯ শতাংশ)। এনসিপির ছয় সাংসদের দুজন এবং স্বতন্ত্র সাতজনের পাঁচজনই পেশায় ব্যবসায়ী।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন মাত্র ১৮ শতাংশ। ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে এই হার ছিল ৬৭ শতাংশ।
সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, “সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রভাব বাড়লে ব্যবসা ও রাজনীতি একাকার হয়। রাজনীতি ব্যবসায়িক মুনাফার পুঁজিতে পরিণত হয়।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে আইনি ও নীতিকাঠামো দখল হয়ে যায়। বিগত সরকারের সময় জ্বালানি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যে লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে, তা এই ‘চোরতন্ত্রের’ বিকাশ। নতুন সরকার এই প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ব্যবসার পরেই সংসদে আইনজীবীদের অবস্থান। ২৯৭ জনের মধ্যে ৩৬ জন আইনজীবী। এর মধ্যে বিএনপির ২৪ জন ও জামায়াতের ৮ জন। এছাড়া চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত ১২ জন সাংসদ। শিক্ষকতা পেশায় রয়েছেন বিএনপির ৪ ও জামায়াতের ২৩ জন। কৃষিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মোট ১৭ জন।
নতুন সাংসদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত। নির্বাচিতদের মধ্যে ২৪৭ জন স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি ডিগ্রিধারী। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বিএনপির ১৭১ জন এবং জামায়াতের ৬১ জন রয়েছেন।
বিপরীতে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন ১৫ জন এবং এইচএসসি পাস করেছেন ১৭ জন। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোননি এমন সাংসদ রয়েছেন ৯ জন, যার মধ্যে একজন নিজেকে স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন।
বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংসদ সদস্যদের বড় অংশই প্রবীণ। ২৯৭ জনের মধ্যে ২১৬ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি। ৬০ বছরের বেশি বয়সী সদস্য রয়েছেন ১৪৫ জন।
সবচেয়ে প্রবীণ সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের মুশফিকুর রহমান (৮৫ বছর ১১ মাস)। এছাড়া কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ ওসমান ফারুক (৮৫) ও পটুয়াখালী-১ আসনের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীও (৮২) প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে অন্যতম।
অন্যদিকে তরুণদের প্রতিনিধিত্বে এগিয়ে আছে এনসিপি। দলটির ছয় সদস্যের সবাই তরুণ এবং পাঁচজনের বয়স ৩০-এর নিচে। সর্বকনিষ্ঠ সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এনসিপির আব্দুল হান্নান মাসউদ (২৫)। বিএনপির সবচেয়ে কম বয়সী সাংসদ গাইবান্ধা-৪ আসনের মোহাম্মদ শামীম কায়সার (৩৫)।
জামায়াতে ইসলামীর সাংসদদের মধ্যে ১৯ জনের বয়স ৫০-এর নিচে এবং সবচেয়ে কম বয়সী কুষ্টিয়া-৩ আসনের আমির হামজা (৩৩)। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের বয়স ৬৭ বছর। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বয়স ৫৭ বছর।