
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় পাহাড় ও সমতলে বড়ই বা কুল চাষে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটির কারণে কাশ্মীরি, বলসুন্দরি ও আপেল কুলসহ বিভিন্ন জাতের বড়ই চাষে ঝুঁকছেন তারা; এতে অল্প খরচে মিলছে দ্বিগুণ লাভ। শীতকালীন এই রসালো ফলটি এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ঢাল ও সমতল ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি বড়ই বাগানে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। গাছে ঝুলছে সবুজ ও লাল আভাযুক্ত পাকা ফল। কোথাও কৃষকরা ফল সংগ্রহ করছেন, আবার কোথাও পরিবারের সদস্যরা সেই ফল বাছাই করে ঝুড়িতে ভরছেন। মৌসুমের ভরা সময়ে স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতেও বড়ইয়ের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই ফল কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাচ্ছেন, যা এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বর্তমানে দীঘিনালায় প্রায় ৮০ হেক্টর বা ৬০০ কানি জমিতে বড়ই চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বলসুন্দরি, কাশ্মীরি, ভারত সুন্দরী, নারকেলি ও আপেল কুল জাতের বড়ই প্রধান। এ অঞ্চলে বছরে আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ মেট্রিক টন বড়ই উৎপাদিত হয়।
মেরুং ইউনিয়নের মধ্যবোয়ালখালী এলাকার চাষি রুপম চাকমা জানান, চাকরি না করে তিনি কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেছেন। পরিবারের সহায়তায় বড় ভাইকে নিয়ে ২০২১ সালে ৬ কানি জমিতে বলসুন্দরি, কাশ্মীরি ও নারকেলি জাতের বড়ই বাগান গড়ে তোলেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন বাগান থেকে ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি বড়ই সংগ্রহ করছেন।
লাভের হিসাব দিয়ে রুপম চাকমা বলেন, প্রতি মৌসুমে কানি প্রতি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করে এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে। শুরুতে ফলন কম থাকলেও নিয়মিত পরিচর্যা ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করায় এখন উৎপাদন অনেক বেড়েছে।
অন্যদিকে কবাখালী ইউনিয়নের হাচিনসনপুর এলাকার চাষি আমির হোসেন ৫ কানি জমিতে বলসুন্দরি, কাশ্মীরি ও আপেল কুল জাতের বড়ই চাষ করেছেন। তিনি জানান, কানি প্রতি তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ কেজি বড়ই সংগ্রহ করছেন এবং কানি প্রতি প্রায় ১ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন।
কৃষকরা জানান, ডিসেম্বর মাস থেকে গাছ থেকে বড়ই তোলা শুরু হয় এবং মার্চ মাসের দিকে শেষ হয়। মৌসুম শেষে একই জমিতে শাক-সবজি চাষ করেও বাড়তি আয় করা যাচ্ছে।
দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, এখানকার কৃষকরা বড়ই বা কুল চাষে দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন। বর্তমানে প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বড়ই চাষ হচ্ছে। মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে পাঁচ বছর পরপর ফসল পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বড়ই চাষকে আরও এগিয়ে নিতে কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমন বলেন, বড়ই চাষ অত্যন্ত লাভজনক। হেক্টরপ্রতি গড়ে ৭ থেকে ৮ টনেরও বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা করলে এর চেয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব।
পরিকল্পিত চাষাবাদ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বড়ই দীঘিনালার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।