
মৃদু শীতের আমেজমাখা বিকেলে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। বঙ্গভবনের চারদেয়ালের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য বা দরবার হলের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নয়, এবার সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। খোলা আকাশের নিচে এই শপথ গ্রহণ কেবল একটি স্থান পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীকী বার্তা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, এই উন্মুক্ত মঞ্চ যেন তারই এক প্রতিচ্ছবি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের এই যাত্রাপথকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই স্বাগত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে আছে একরাশ সতর্কতা, বিপুল প্রত্যাশা এবং অতীতে ফিরে না যাওয়ার দীপ্ত শপথ।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যখন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয়তো ভেসে উঠছিল গত দেড় বছরের ঘটনাবহুল স্মৃতি। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর করল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ছিল একটি বড় পরীক্ষা। একটি পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে, কিন্তু এখন শুরু হলো আসল পরীক্ষা—রাজনীতিবিদদের পরীক্ষা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন সরকারকে ফুলের বিছানায় নয়, হাঁটতে হবে কণ্টকাকীর্ণ পথে। অর্থনীতি এখন ধুঁকছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন একেকটি ধ্বংসস্তূপ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হবে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা শুনতে মধুর, কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ, ক্ষমতার অলিন্দে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এই শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোরতার প্রয়োজন, তা নতুন সরকার দেখাতে পারবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে দেখা যায় নবীন ও প্রবীণের একটি মিশ্রণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার আত্মবিশ্বাস এখানে স্পষ্ট। তবে মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে জনমনে মৃদু গুঞ্জন রয়েছে। এত বিশাল বহর কি আসলেই প্রয়োজন ছিল? বিশেষ করে যখন কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হচ্ছে। তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—মন্ত্রিসভায় এমন অনেক মুখ ফিরে এসেছেন, যারা বিএনপির বিগত শাসনামলে দায়িত্বে ছিলেন এবং তাদের সবার পারফরম্যান্স বা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ছিল না। কারও কারও বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ছিল। পুরনো সেই বিতর্কিত মুখগুলো নতুন সময়ে নতুন বোতলে পুরনো মদ হয়েই আবির্ভূত হন, নাকি নিজেদের শুধরে নিয়ে দেশসেবায় ব্রতী হন—তা নিয়ে সংশয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। নতুনদের নিয়েও সমালোচনা আছে। তবে আমরা আশা করতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিষয়গুলোতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখবেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতি যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে।
তবে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। শপথ নেওয়ার পরপরই বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং অভিনন্দনযোগ্য। সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট গ্রহণ না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বাংলাদেশের বিলাসিতা-সর্বস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিরল দৃষ্টান্ত। এটি যদি কেবল লোকদেখানো সিদ্ধান্ত না হয়ে প্রকৃত চর্চায় পরিণত হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতিকদের প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে। আমরা মনে করি, নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম ১০০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন মাসে সরকার কোন পথে হাঁটবে—সংস্কারের পথে নাকি পুরনো জঞ্জাল আঁকড়ে ধরার পথে—তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিনেই রাজনীতির আকাশে কিছুটা কালো মেঘের আনাগোনা দেখা গেছে। সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াচ্ছিলেন, তখন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সাধারণ শপথের পাশাপাশি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
শুরুতেই এই মতপার্থক্য কেন? এটি কি কোনো কৌশলগত অবস্থান, নাকি জোটের শরিকদের সঙ্গে কোনো মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের ইঙ্গিত? এই ঘটনা যেন নতুন করে কোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বা বিভাজন তৈরি না করে, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল হিসেবে বিএনপির কাঁধেই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তাদের মনে রাখতে হবে, অহংবোধ বা একপেশে সিদ্ধান্ত অতীতে অনেক সরকারের পতন ডেকে এনেছে। জাতীয় সংসদকেই হতে হবে সমস্ত মতপার্থক্য নিরসনের কেন্দ্রবিন্দু। রাজপথের বিবাদ সংসদে না এনে, সংসদের আলোচনা দিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সরকার কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফসল নয়। এর পেছনে রয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগ। সেই রক্ত ও ঘামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সরকারি এবং বিরোধী—উভয় দলেরই নৈতিক দায়িত্ব। পুরনো প্রতিহিংসার রাজনীতি, বিরোধী মতকে দমন করার সংস্কৃতি কিংবা ‘বিজয়ী মানেই সবকিছুর মালিক’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
নতুন সরকারের সামনে অবারিত সুযোগ। তারা চাইলে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে, যেখানে আইনের শাসন হবে প্রধান মানদণ্ড। আবার তারা চাইলে পুরনো পথে হেঁটে ক্ষমতার অপব্যবহারও করতে পারে। তবে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে দরজা খুলে দিয়েছে, তাকে কোনোভাবেই বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।
আমরা আশা করি, দক্ষিণ প্লাজার খোলা বাতাসের মতো সরকারের কার্যক্রমও হবে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত। শপথের প্রতিটি শব্দ যেন মন্ত্রীদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে। নতুন সংসদ ও সরকারের যাত্রাপথ মসৃণ হোক, দেশের মানুষ ফিরে পাক তাদের কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সমৃদ্ধি—এটাই আজকের দিনে আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।