
কাঁচামাল সংকট, প্রশাসনিক কড়াকড়ি, পরিবেশগত বিধিনিষেধ এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নির্মাণখাতের অন্যতম চালিকাশক্তি ইটভাটা শিল্প এখন চরম সংকটে। একসময় মৌসুমজুড়ে ব্যস্ত থাকা বহু ভাটা এখন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
ভাটা মালিকরা বলছেন, এ বছর মাটি জোগাড় করতে না পেরে ইতোমধ্যে ১৪টি ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আগামী বছর ৮০ শতাংশ ভাটা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কিন্তু কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কাটার অভিযোগে প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে। ভাটা মালিকদের দাবি, আগে স্থানীয় জমি থেকে চুক্তির মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করা গেলেও এখন আইনগত জটিলতা ও প্রশাসনিক তদারকির কারণে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, ‘‘কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এ অঞ্চলে ইট শিল্প এখন চরম হুমকির মুখে। এভাবে প্রশাসনের বাধা-নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকলে দু-এক বছরের মধ্যে সাতকানিয়ার সব ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। কৃষিজমির টপসয়েল কাটার পক্ষে আমরাও নই। তবে টপসয়েল ছাড়া যেসব মাটির উৎস আছে, সেগুলো আমাদের নির্ধারণ করে দেওয়া হোক।’’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইট পোড়ানোর মৌসুমে শ্রমিকরা ৫০-৬০ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, যা উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
সমিতির সভাপতি মো. নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘‘আমরা সরকারের সব নিয়ম মেনে ইটভাটা স্থাপন করেছি। একেকটি ইটভাটায় ৫ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। এত টাকা বিনিয়োগ করেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় মাটি জোগাড় করতে না পারায় ইট শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।’’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটার ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই আইন অনুযায়ী ভাটা পরিচালনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘‘ইটভাটা শিল্প প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। কৃষিজমির টপসয়েল কাটলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তাই আমরা আইন অনুযায়ী কঠোর নজরদারি করছি। অনুমোদনবিহীন ভাটা বা অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইট উৎপাদনের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাজের নিশ্চয়তা না পেয়ে অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, বাজারে ইটের সরবরাহ কমে যাওয়ায় নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় ঠিকাদাররা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে।
এদিকে সরকার ও প্রশাসন ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক বা পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে মালিকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে ভাটা মালিকরা বলছেন, ব্লক উৎপাদনে রূপান্তর সহজ নয়; এর জন্য বড় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সহজ ঋণ ও বাজার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।