সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন দরপত্র, সরকারের ১০০ দিনের রোডম্যাপ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২:২৫ অপরাহ্ন


স্থলভাগ ও সাগরে (অনশোর ও অফশোর) গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করছে সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই আদর্শ উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (মডেল পিএসসি) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

২০১২ সালে ভারত এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর, সমুদ্রের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের এটিই প্রথম বড় ধরনের উদ্যোগ হতে যাচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য অফশোর বিডিং বা দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সময়সীমা তিন মাস বাড়ালেও কোনো সাড়া মেলেনি। পেট্রোবাংলার সংশোধিত নথিপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও, বিষয়টি পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

১০০ দিনের রোডম্যাপ ও অগ্রাধিকার

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত বুধবার নিজ দপ্তরে প্রথম দিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি সভায় জ্বালানি খাতের এই ১০০ দিনের রোডম্যাপ বা রূপরেখা তুলে ধরেন। সভা শেষে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো আসন্ন রমজান ও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য পূরণের পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

এই রোডম্যাপের আওতায় নতুন সরকার কমপক্ষে সাতটি অনুসন্ধান কূপ, সাতটি উন্নয়ন কূপ এবং দুটি ওয়ার্কওভার কূপ খননের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। উল্লেখ্য, উৎপাদন বাড়াতে পরিচিত গ্যাসক্ষেত্রে উন্নয়ন কূপ এবং পরিত্যক্ত কূপ থেকে অবশিষ্ট গ্যাস উত্তোলনে ওয়ার্কওভার কূপ খনন করা হয়।

সরকারের লক্ষ্য, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে ৪৬টি কূপ থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ৬৫ কোটি ২০ লাখ (৬৫২ মিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা। বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) নিজস্ব পাঁচটি রিগ পরিচালনা করছে এবং চারটি ভাড়া নিয়েছে। চলমান অনুসন্ধান কার্যক্রমে আরও দুটি ড্রিলিং রিগ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

এলএনজি ও এলপিজি অবকাঠামো উন্নয়ন

পরিকল্পনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করে একজন ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার পাইপলাইন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহের জন্য সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়েও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সিস্টেম লস বা চুরি ও ছিদ্রজনিত অপচয় রোধ করা সরকারের আরেকটি অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে সিস্টেম লস বর্তমানের ৬.৩৮ শতাংশ থেকে ৬.২৫ শতাংশে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস অপচয় হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে একটি কাঠামো তৈরি করা হবে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জিটুজি (সরকার থেকে সরকার), পিপিপি এবং অন্যান্য মডেল মূল্যায়নে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।

রিফাইনারি সম্প্রসারণ ও কাঠামোগত সংস্কার

গভীর সমুদ্রে থাকা মাদার ভেসেল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ (এসপিএম) ফেসিলিটির অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি চালু হলেও অপারেটর নিয়োগে বিলম্বের কারণে এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

একই সময়ের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে পরিশোধন ক্ষমতা বার্ষিক ১৫ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছে। এতে অর্থায়নে বেশ কয়েকটি দাতা সংস্থা আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যানসহ মূল জ্বালানি বিধিমালায় সংশোধনী আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে তিন ভাগে বিভক্ত করা এবং বিপিসির অধীন আটটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে পাঁচটি কোম্পানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কয়লাসহ নদী ও অফশোর এলাকার খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন করতে একটি সমন্বিত কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হবে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতের অংশীজনদের সক্ষমতা বাড়াতে সেমিনার, প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের জন্য নতুন ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।