
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার মতো বিষয়গুলোতে হোঁচট খেলে এই সরকারকে নানামুখী রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে শনিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
টাইম ম্যাগাজিনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের যে অসন্তোষ রয়েছে, তা রাতারাতি মিটে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সদ্য শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার এই রাজনৈতিক সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে থমকে থাকা অর্থনীতিকে তিনি কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন, তার ওপর।
বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপির আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমানে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির এই দেশে যা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বড় বাজেট বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু টাইম ম্যাগাজিন বলছে, এ ধরনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
উচ্চ খাদ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাই এর প্রধান কারণ। এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং শহরাঞ্চলে খাদ্যের দাম কমাতে খামার থেকে শহর পর্যন্ত থাকা শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগীদের দমনে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেক প্রবাসী অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল ছেড়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে শুরু করেন। এর ফলে ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শ্রম রপ্তানি খাতে তীব্র দুর্নীতি ও শোষণের কারণে বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশিদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনবিষয়ক একটি প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দেওয়া বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ বলেন, বড় পরিকল্পনা মাথায় রাখার পাশাপাশি জরুরি বাস্তবায়নের জন্য উচ্চপ্রভাবশালী ছোট ছোট প্রকল্পের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। এছাড়া ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থনীতির পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সম্পর্কও নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে বলে টাইম ম্যাগাজিন মনে করে। নির্বাচনি ইশতেহারে আসিয়ানে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সার্কের ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটাই তিক্ত হয়ে উঠেছে। আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি এবং তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে দিল্লির নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় এই সম্পর্ক উন্নয়নে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। সম্প্রতি ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নতুন সরকারের কাছে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঝুঁকিগুলো তুলে ধরার কথা বলেছেন, যা বেইজিংয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমানের সামনে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বড় সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।