সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আনোয়ারায় এমপির ‘শোডাউনে’ অবরুদ্ধ হাসপাতাল, চরম বিপাকে রোগীরা

জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ৫:২৬ অপরাহ্ন


হাসপাতাল মানেই এক নিস্তব্ধ আর প্রশান্তির জায়গা, যেখানে রোগীরা আসেন একটু স্বস্তি আর সুচিকিৎসার আশায়। কিন্তু চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সোমবারের চিত্রটি ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের আর্তনাদ ছাপিয়ে সেখানে শোনা যাচ্ছিল কেবল নেতা-কর্মীদের কোলাহল।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে তাঁর সঙ্গে থাকা শত শত নেতা-কর্মীর বিশাল বহরে হাসপাতালটি যেন মুহূর্তেই এক রাজনৈতিক জনসভায় পরিণত হয়। আর এই প্রটোকলের ভিড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন সাধারণ রোগীরা।

সোমবার বেলা ১২টার দিকে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম দলবল নিয়ে যখন হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করেন, তখন চারদিকে কেবলই বিশৃঙ্খলা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং একুশে পত্রিকার হাতে আসা ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, নেতা-কর্মীদের উপচে পড়া ভিড়ে হাসপাতালের প্রবেশমুখ ও বহির্বিভাগ পুরোপুরি অবরুদ্ধ। কারও হাতে মুঠোফোন, কেউবা ব্যস্ত সেলফি তোলায়। মুমূর্ষু রোগীদেরও চিকিৎসকের কক্ষে বা টিকিট কাউন্টারে পৌঁছাতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরাও যখন এমপির প্রটোকল নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিয়মিত চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা অসুস্থ রোগীরা দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন জগদীশ দে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হাসপাতাল হলো নিরিবিলি জায়গা, কিন্তু এখানে আজ মনে হচ্ছে রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে। রোগীদের কষ্টের দিকে কারও নজর নেই। এতগুলো দলবল নিয়ে ভর্তি থাকা রোগীদের ওয়ার্ডে গিয়ে এভাবে সেলফি ও ছবি তোলা সত্যি দৃষ্টিকটু।

হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন জনসমাগমের বিষয়ে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দীন চৌধুরী একপ্রকার অসহায়ত্বই প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আসলে এটা নিয়ে আমার তো কিছু করার নাই, উনি স্থানীয় এমপি। হাসপাতালে সামান্য অসুবিধা হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই। তবে তিনি হাসপাতালে কী কী সমস্যা আছে, আমাকে তার নোট দিতে বলেছেন। ভিড়ের কারণে রোগীদের অসুবিধা প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা স্বীকার করে বলেন, এত ভিড়ে অসুবিধা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এদিকে জনপ্রতিনিধির এই আকস্মিক ও বিশাল বহরের পরিদর্শন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

মোহাম্মদ রেজাউল করিম সাজ্জাদ নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে এমপির পরিদর্শনের ছবি যুক্ত করে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, শত শত নেতা-কর্মী নিয়ে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। এতে কিছুক্ষণ মেডিকেলে ভর্তি থাকা রোগীরা দুর্ভোগে ভোগেন। পরিদর্শন হতে হবে সিঙ্গেল। যাতে রোগী ও দর্শনার্থীদের সাথে খোলামেলা কথা বলতে পারে এমপি। মেডিকেলের যাবতীয় দুর্নীতি, অনিয়মের কথা ঠিকমতো শুনতে পারে। এখন পরিদর্শনটা একধরনের লোকদেখানো হয়ে গেছে।

সেই পোস্টের নিচে শারমিন কলি নামের একজন মন্তব্য করেছেন, আমাদের দেশের এত সময় যে তারা সারাজীবন শুধু নেতার পেছনে দৌড়ায়, এ দৌড়ানো যত দিন বন্ধ হবে না, তত দিন দেশ থেকে ভালো কিছু আশা করা বোকামি।

অন্যদিকে মোহাম্মদ সাদিক খান নামের আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ১৭ বছর পর ক্ষমতা পাইছে, সেটা দেখাতে হবে না?

সব মিলিয়ে, জনপ্রতিনিধির এই পরিদর্শন সাধারণ মানুষের কাছে সেবার বার্তার চেয়ে ভোগান্তির রূপ নিয়েই বেশি ধরা দিয়েছে।