
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নিরীহ মানুষ যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সেই লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকের পর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর কিছু সুবিধাবাদী মানুষ ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের নামে হয়রানিমূলক মামলা করেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এসব মামলা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুলিশ সরকারকে প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা আবারও তদন্ত করা হবে বলে সালাহউদ্দিন আহমদ নিশ্চিত করেছেন।
সভায় নেওয়া অন্যান্য সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে দেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলোও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া লাইসেন্সগুলো বাতিল করা হবে। পাশাপাশি পুলিশের কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কঠোরভাবে বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারদের (এসপি) প্রটোকল দেওয়ার বিষয়েও নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। এখন থেকে এসপিরা বিধির বাইরে গিয়ে কাউকে ব্যক্তিগত প্রটোকল দেবেন না। এছাড়া লটারির মাধ্যমে ওসি ও এসপি পদায়ন পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড রক্ষার্থে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসাতে এই পদ্ধতি বাতিল করা হলো। আওয়ামী লীগ আমলে স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি করে কনস্টেবল পদে চাকরি নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়েও পুলিশকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, পুলিশে খালি থাকা ২ হাজার ৭০১টি কনস্টেবল পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হবে এবং ২০০৬ সালে চাকরি হারানো ৬৩০ জন পুলিশ সদস্য তাদের চাকরি ফিরে পাবেন।
পাসপোর্ট অফিসের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রাথমিকভাবে দলিল লেখকদের মতো পাসপোর্টের জন্য নিবন্ধিত সহায়তাকারী নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে সহায়তা করবেন। মব ভায়োলেন্স বা মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের বিষয়েও সরকার কঠোর অবস্থান নেবে বলে তিনি জানান। অন্যদিকে একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রত্যেকেরই নিজের কথা বলার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী, এসবির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. গোলাম রসুল, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব দেলোয়ার হোসেন, সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্লাহ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার এবং এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার ওই সভায় অংশ নেন। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।