সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হতে পারে আমাদের অর্থনীতির রক্ষাকবচ

মোস্তফা আল মাহমুদ | প্রকাশিতঃ ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১২:০৩ অপরাহ্ন


বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কৌশল। বর্তমানে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা কেবল জ্বালানি আমদানিতেই ব্যয় হচ্ছে। অথচ একই সময়ে আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ এমএমসিএফ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ জ্বালানি কিনতেই ব্যয় হয়ে যাওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমে যাচ্ছে। ফলে দেশের শিল্পায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের জন্য কেবল একটি বিকল্প ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথ।

অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও সম্ভাবনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক। প্রথমত, আমদানি-নির্ভর তেল, কয়লা ও এলএনজির পরিবর্তে দেশীয় সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। দ্বিতীয়ত, সাশ্রয় হওয়া সেই ডলার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যবহার করে শিল্পায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৫ থেকে ৭ টাকায় উৎপাদন করা সম্ভব। চতুর্থত, স্থিতিশীল নীতি থাকলে এ খাতে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাবে। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কেন্দ্র স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে সারা দেশে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৃহৎ পরিসরে গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।

জরুরি নীতিগত সহায়তা

এ খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আনতে কিছু সুস্পষ্ট নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এক. ভূমি ও ট্রান্সমিশন লাইন প্রস্তুত করা। সরকার যদি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি (গ্রিড সাবস্টেশনের নিকটবর্তী খাস বা অধিগ্রহণযোগ্য জমি) চিহ্নিত করে এবং ট্রান্সমিশন লাইন আগে থেকেই প্রস্তুত করে দেয়, তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে। জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট সাবস্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর সমন্বয়ে এ বিষয়ে জেলাভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

দুই. শতভাগ শুল্কমুক্ত সরঞ্জাম। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমাতে এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, বিইএসএস (BESS), উইন্ড টারবাইনসহ সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত করা প্রয়োজন। তিন. স্বল্প সুদে সবুজ ঋণ। ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ‘গ্রিন ফাইন্যান্স স্কিম’ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

চার. কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। পাঁচ. গ্রিডে বিইএসএস (BESS) সংযোজন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গ্রিড সাবস্টেশনগুলোতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এতে পিক-লোড ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদনগত ওঠানামা সামাল দেওয়া যাবে।

নদীকেন্দ্রিক সমন্বিত উন্নয়ন মডেল

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। প্রশস্ত নদীগুলোর দুই তীরকে কেন্দ্র করে সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব প্রকল্পে নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, সড়ক নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

এর ফলে বহুমাত্রিক সুফল পাওয়া যাবে। নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভাঙন রোধ ও সড়ক নির্মাণের ফলে নদীতীর সংরক্ষিত হবে। পুনরুদ্ধার করা জমির সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিজমি বাড়বে। চরাঞ্চলের মানুষ মূল অর্থনীতির স্রোতে যুক্ত হয়ে টেকসই উন্নয়নের অংশীদার হবে। এ ছাড়া নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ কমে লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস পাবে এবং স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাতের প্রসারের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। সব মিলিয়ে নির্মাণ, পরিচালনা, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক খাতে ২০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

আগামীর পথরেখা

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তের সময় উপস্থিত। আমরা কি প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াব, নাকি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, কর্মসংস্থানমুখী ও টেকসই ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হব?

সঠিক নীতিগত সহায়তা, ভূমি প্রস্তুতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং গ্রিড আধুনিকায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের হাতিয়ার, শিল্পায়নের চালিকাশক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে এটি একটি টেকসই ও নিরাপদ বাংলাদেশের পথনির্দেশ করতে সক্ষম। এখন সময় সাহসী সিদ্ধান্তের—নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক রূপান্তর বা ট্রানজিশনই হোক আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)