সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বান্দরবানের ফেলে আসা দিনগুলোর খোঁজে

সাইফুল আযম | প্রকাশিতঃ ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১০:৩৬ অপরাহ্ন

আমাদের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল তৎকালীন অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম। সময়ের পরিক্রমায় তা আজ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন জেলায় বিভক্ত। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদেই আমাদের পরিবার এই বান্দরবান জেলায় শেকড় গেড়েছিল। পার্বত্য জেলা নিয়ে কিছু না লিখলে মনের ভেতর একধরনের অপূর্ণতা থেকে যায়। সাতকানিয়ার হলুদিয়া থেকে শুরু করে থানচির বড়মদক পর্যন্ত বিস্তৃত এই বান্দরবানের আজকের রূপ আর ৩০-৩৫ বছর আগের রূপের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।

তিন দশক আগেও বান্দরবান থেকে থানচি যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল খরস্রোতা নদীপথ। বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীতে নৌকায় করে সেই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া আজ যেন নিছকই রূপকথার গল্প। তখন বিশুদ্ধ পানীয় জল, উন্নত চিকিৎসা, বাসযোগ্য ভালো ঘরবাড়ি কিংবা বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মানুষের জীবনযাত্রা নির্ভরশীল ছিল কেবল জুম চাষ, তামাক চাষ ও পশুপালনের ওপর। যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় পাহাড়ে উৎপাদিত রসালো ফল—কাঁঠাল, জাম্বুরা, আম কিংবা কলা গাছেই পেকে মাটিতে পড়ে নষ্ট হতো। নদীতে সুস্বাদু বড় বড় মাছ পাওয়া গেলেও বিদ্যুতের অভাবে তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না।

কিন্তু আজ সেই বান্দরবান আর নেই। চিম্বুক পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ। শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি বিভাগের অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষ এখন তামাক চাষের বদলে বিশ্বমানের কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, আনারস, বানানা ম্যাংগো, কমলা ও ড্রাগন ফলের চাষ করছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে পাহাড়ের এসব কৃষিপণ্য এখন সহজেই সমতলে পৌঁছে যাচ্ছে এবং প্রান্তিক কৃষকরা পাচ্ছেন তাদের ন্যায্যমূল্য। সমতলের মানুষও কম দামে নানা জাতের সতেজ ফলমূল উপভোগ করতে পারছে।

বান্দরবানের নামকরণ নিয়ে একটি চমৎকার লোককথা প্রচলিত আছে—বলা হয়, একসময় বানরেরা নাকি এখানকার নদীতে বাঁধ দিয়েছিল, আর সেখান থেকেই ‘বান্দরবান’ নামের উৎপত্তি। ঠিক তেমনি রুমা উপজেলার বগালেক নিয়েও রয়েছে রহস্যময় গল্প। ‘বগা’ শব্দের অর্থ ড্রাগন বা সাপ। কথিত আছে, আগে সেখানে একটি আস্ত গ্রাম ছিল। গ্রামবাসীর পাতা ফাঁদে একটি বিশাল সাপ ধরা পড়ার পর এক বৃদ্ধার নিষেধ অমান্য করে তারা সেটি খেয়ে ফেলে। এরপর রাতেই এক বিকট শব্দে পুরো গ্রামটি দেবে গিয়ে সৃষ্টি হয় আজকের এই বগালেক।

পাহাড়ের এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে আজ মিলনছড়ি, শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, নীলাচল, নীলগিরি, নীল দিগন্ত, রাজাপাথর, ঋজুক ঝরনা, নাফাখুম ও আমিয়াখুমের মতো জায়গাগুলোতে ছুটে আসছেন হাজারো পর্যটক। অথচ একসময় এই পাহাড়ে ম্যালেরিয়া ও জন্ডিসের মতো রোগের ভয়াবহ প্রকোপ ছিল। ম্যালেরিয়ায় ভুগে আমার চোখের সামনেই অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমার পরিচিত এক প্রাণোচ্ছল তরুণ, যাকে আমি আদর করে ‘সালমান শাহ’ ডাকতাম, ২০০৫ বা ২০০৭ সালের দিকে তার সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর আর কোনোদিন দেখা হয়নি। সে বেঁচে আছে কিনা তাও জানা নেই, তবে বেঁচে থাকলে এই লেখাটি পড়ে সে হয়তো আমাকে স্মরণ করবে।

উন্নয়নের এই জোয়ারে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও, রাস্তাঘাট সম্প্রসারণের কারণে শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত শতবর্ষী প্রাচীন তেঁতুল গাছগুলো হারিয়ে যাওয়ায় মনে কিছুটা আক্ষেপও জাগে।

সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্তানেরা আজ পিছিয়ে নেই। তারা নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মেডিকেলের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার স্বাক্ষর রাখছে। দুর্গম থানচি উপজেলার অনেক সন্তান আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিকিৎসক, শিক্ষক, কৃষিবিদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পেশায় যুক্ত হয়ে দেশের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।

বান্দরবান জেলায় মারমা, মুরং (ম্রো), ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বম, খেয়াং, চাক, পাংখোয়া ও তংচংগ্যাসহ মোট ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে মারমা সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি ও গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলের একটি দীর্ঘ বিবর্তন রয়েছে। এক সময়ের প্রচলিত রাজপ্রথা ও রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠান মূলত এই জেলাতেই উদযাপিত হয়ে থাকে।

সকল বিভাগ এবং স্থানীয় মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই বান্দরবানের এই অভাবনীয় উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের মাঝে এই সম্প্রীতির বন্ধন চিরকাল অটুট থাকুক। আজ পাহাড়ের বুক চিরে যে আলো প্রবেশ করেছে, সেই আলোয় আলোকিত হোক আগামী প্রজন্ম। আর তাই, আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ধর্ম-বর্ণের শিশুদের প্রতি উৎসর্গ করছি, যারা এই বর্ণিল পাহাড়ের আগামীর কাণ্ডারি।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।