
দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর ফেরার পথের দিকে চেয়ে আছেন এক নারী। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল আলম সিরাজ যখন বিএনপির ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি, তখন থেকেই তাঁর স্ত্রী সুলতানা পারভীনের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। তবে এই বিভীষিকাময় জীবনের মাঝেও স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে চান তিনি।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সংরক্ষিত নারী আসনে যোগ্যদের মনোনীত করতে জোর ভাবনা-চিন্তা চলছে সরকারি দল বিএনপিতে। বিগত বছরগুলোতে যারা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং দলের স্বার্থে যেসব ত্যাগী নেতা গুম হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ার গুঞ্জন দলের ভেতরেই জোরালো হচ্ছে। কেন্দ্রের এমন চিন্তাভাবনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এখানে প্রত্যাশীর তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। চট্টগ্রাম থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্ব করতে আগ্রহীদের মধ্যে বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, ফাতেমা বাদশা, মনোয়ারা বেগম মনি, জেলী চৌধুরী, মেহেরুন নেছা নার্গিস এবং জান্নাতুল নাঈম রিকু-এর নাম। পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন নাজমা সাঈদ, জেবুন নেছা রুনা এবং সুলতানা পারভীন। দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করা এই নেত্রীদের কর্মী-সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাচ্ছেন।
সিরাজের আত্মত্যাগ ও ফটিকছড়ির মানুষের প্রত্যাশা
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম-২) আসনের মানুষের কাছে শহিদুল আলম সিরাজ একটি আবেগের নাম। উপজেলা বিএনপির এই ত্যাগী নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী-এর একনিষ্ঠ কর্মী সিরাজ দলের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। তিনি গুম হওয়ার পর থেকে গত ১৭ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অসহায় পরিবারটির খোঁজখবর রেখেছেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
এখন লেলাং ইউনিয়নসহ পুরো ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি, গুমের শিকার এই জনপ্রিয় নেতার সহধর্মিণীকে সংরক্ষিত আসনে সুযোগ দিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে লাগানো হোক।
বুকভরা শূন্যতা ও অবিচল প্রত্যয়
স্বামীর শূন্যতা কতখানি যন্ত্রণার, তা কথায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজের জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা নিয়ে সুলতানা পারভীন অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, দলের দুঃসময়ে তাঁর স্বামী নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে কাজ করেছেন এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েই গুমের নির্মম শিকার হয়েছেন। প্রিয় মানুষকে ছাড়া একটি জীবন কতটা বিভীষিকাময় হতে পারে, তা কেবল একজন ভুক্তভোগীই গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন।
তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান, স্বামীর এই চরম ত্যাগের মূল্যায়নস্বরূপ তাঁকে যদি সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করা হয়, তবে তিনি আজীবন দলের আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল থাকবেন। তবে পদ-পদবির দৌড়ে নয়, দলের যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকেই তিনি নিজের শেষ কথা হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত।