সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা বাড়ছে, শীর্ষে হতাশা ও অভিমান

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ৩:০৩ অপরাহ্ন


দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ২০২৫ সালে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। এসব আত্মহত্যার পেছনে হতাশা ও অভিমান সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে উঠে এসেছে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যা সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ সমীক্ষা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৪০৩ জন আত্মহননকারী শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯০ জনই স্কুল পর্যায়ের, যা মোট ঘটনার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কৈশোরের সূচনালগ্নে আবেগীয় অস্থিরতা, পরিচয় সংকট এবং একাডেমিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। মোট আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ২৪৯ জন নারী এবং ১৫৪ জন পুরুষ। স্কুল পর্যায়ে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ, এবং কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ৪১ জন পুরুষ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, কৈশোরে মেয়েরা পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপোড়েন এবং আবেগীয় সংকটে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থান সংকট বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যার পেছনে হতাশা ২৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং অভিমান ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। হতাশাজনিত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন এবং পুরুষ ৫০ জন। অভিমানে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ৫৮ জন ও পুরুষ ৩৬ জন।

একাডেমিক চাপে ৭২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের এবং এর মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশই নারী। এছাড়া প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন, পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি, যা ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন শিশুর আত্মহত্যার ঘটনাকে সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ৬৩ জন, বরিশালে ৫৭ জন এবং রাজশাহীতে ৫০ জন আত্মহত্যা করেছে। সমীক্ষায় বলা হয়, এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত এক সামাজিক সংকট।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৬ জন মেডিকেল কলেজের এবং ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে হতাশা এবং প্রেমঘটিত কারণ উল্লেখযোগ্য হারে দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশার হার আরও বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে আঁচল ফাউন্ডেশনের বক্তারা বলেন, পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিং ব্যবস্থার ঘাটতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক অজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্টিগমা বা নেতিবাচক ধারণা কমাতে প্রচারণা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন। বক্তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করা নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রতিবেদন নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।