সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি এড়াতে কার্যকর পথ খোঁজা জরুরি

নজরুল কবির দীপু | প্রকাশিতঃ ১ মার্চ ২০২৬ | ৩:৪২ অপরাহ্ন


শীতের স্নিগ্ধ আমেজ শেষ হতে না হতেই প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছে গ্রীষ্মের রুক্ষতা। আর এই গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জনমনে যে শঙ্কাটি সবচেয়ে বেশি ভর করে বসছে, তা হলো ভয়াবহ লোডশেডিং। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন নতুন সরকারের জন্য এক বিশাল, অভাবনীয় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রকট চ্যালেঞ্জটি কেবল এক রাতের ব্যবধানে তৈরি হয়নি; বরং এটি পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া এক পাহাড়সম বকেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিসংকটের এক অত্যন্ত ভারী উত্তরাধিকার। এই রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ থেকে শুরু করে প্রথিতযশা জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন, আসন্ন গ্রীষ্মে এক অবর্ণনীয় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে পারে পুরো দেশ। তাই এই আসন্ন সংকট মোকাবিলায় সরকারের এখন সর্বোচ্চ, অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান আর্থিক হিসাবনিকাশের দিকে তাকালে এখন কেবলই এক চরম হতাশার চিত্র চোখে পড়ে। সরকারি এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পুঞ্জীভূত পাওনার পরিমাণ জমতে জমতে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অঙ্কে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি খাতের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনাই দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। ভারতের বিতর্কিত আদানি গ্রুপের মতো বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও তাদের বকেয়া পাওনা আদায়ে সরকারকে প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড রকমের চাপ দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন—বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধ না করা হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। তাদের কাছেও প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল গ্যাস বিল বকেয়া হিসেবে জমে আছে। সব মিলিয়ে গ্যাস, কয়লা এবং তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র—এই তিনটি প্রধান খাতেই এখন এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে পুরো দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিতে পারে।

আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে, এটি একটি সাধারণ হিসাব। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ও পূর্ববর্তী বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই বছর গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা অনায়াসেই সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। শীত মৌসুমের শান্ত দিনগুলোর তুলনায় গ্রীষ্মের খরতাপে পোড়া দিনগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা দিনে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হু হু করে বেড়ে যায়। প্রচণ্ড গরমের কারণে সাধারণ গৃহস্থালি থেকে শুরু করে সর্বত্র ভোক্তাপর্যায়ে এসি, ফ্যান ও কুলারের মতো যন্ত্রপাতির ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

এর বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে তা হলো, এই সময়টা দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সময়। এটি হলো কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির বোরো ধানের উৎপাদনের প্রধান মৌসুম, যেখানে সেচকাজের জন্য পাম্প চালাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা যদি সহনশীল পর্যায় অতিক্রম করে, তবে একদিকে যেমন গরমে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র জন-অসন্তোষ তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে দেশের শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সর্বোপরি বোরো ধানের উৎপাদনও চরমভাবে ব্যাহত হবে। কৃষি ও শিল্পের চাকা একবার থমকে গেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে।

বিদ্যুৎ খাতের আজকের এই রুগ্ণ ও ভঙ্গুর দশার পেছনে অতীত সরকারের অদূরদর্শী ভুল নীতি, সীমাহীন দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনা সরাসরি দায়ী। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দেশের ভেতরে গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস তেলসহ জ্বালানির প্রাথমিক ও নির্ভরযোগ্য উৎসগুলো নিশ্চিত না করেই, সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এবং যথেচ্ছভাবে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার হীন উদ্দেশ্যে, দেশের সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে এই খাতে একের পর এক অস্বচ্ছ ও অসম চুক্তি করা হয়েছে।

এর অনিবার্য ফলস্বরূপ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ কল্পনাতীতভাবে বেড়ে গেছে এবং জনগণের কাঁধে চেপেছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়ার এক বিশাল বোঝা। খাতা-কলমে দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট দেখানো হলেও, নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো—জ্বালানি সংকটের কারণে এবং ডলারের অভাবে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিতর্কিত দায়মুক্তি আইন পাস করে বিদ্যুৎ খাতের যাবতীয় লুটপাট, দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার যে একপেশে ব্যবস্থা বলবৎ ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে তা সাহসিকতার সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু একটি আইন বাতিল করলেই তো আর বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা যায় না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দুষ্টচক্র থেকে স্থায়ীভাবে বের করে আনার জন্য যে ধরনের সুদূরপ্রসারী, টেকসই ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, তার চরম ঘাটতি রয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে, কেবল সংকট দেখা দিলে তা সামাল দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক বা জোড়াতালি দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, যা বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই কোনো ভিত্তি দিতে পারেনি।

এখন এই বিশাল ও জটিল সংকট থেকে উত্তরণের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে নতুন সরকারের কাঁধে। বর্তমান সরকারকে অবশ্যই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পর্বতপ্রমাণ সংকট এবং সীমাহীন অব্যবস্থাপনার বেড়াজাল থেকে চিরতরে মুক্ত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। দেশের ভেতরে স্থলভাগ এবং সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই মূল মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিস্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি আশু করণীয় হিসেবে সরকারকে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে জনগণের চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বাস্তবসম্মত ও অত্যন্ত কার্যকর পথ এখনই খুঁজে বের করতে হবে। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার চলমান সীমান্ত সংঘাত এবং ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে নতুন করে কোনো বড় ধরনের অস্থিরতা বা মূল্যবৃদ্ধি তৈরি হয় কি না, সেদিকেও সরকারকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে, কারণ বিশ্ববাজারের সামান্যতম ঢেউও আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।

দেশের বর্তমান ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা এবং দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা নতুন বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার। আর এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো কারখানায় এবং কৃষিক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। কোনো বিনিয়োগকারীই অন্ধকারের দেশে পুঁজি খাটাতে আসেন না। লোডশেডিংয়ের কারণে যেন কোনোভাবেই দেশের প্রাণভোমরা কৃষি এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি শিল্প উৎপাদনে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে নিবিড় ও সার্বক্ষণিক মনোযোগ দেওয়া উচিত।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।