
চট্টগ্রামের রাউজানের দিগন্তজোড়া মাঠে এখন হলুদের রাজত্ব। সবুজের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো সূর্যমুখী। বাতাসে দোল খাওয়া এই দৃষ্টিনন্দন হলুদ ফুলগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বরং এখানকার কৃষকদের চোখে এঁকে দিচ্ছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার এক নতুন সোনালি স্বপ্ন। কৃষিপ্রধান এই উপজেলার মাঠের চিত্রে যেন এক নীরব বিপ্লব ঘটছে, আর সেই পরিবর্তনের মূল রূপকার এই সূর্যমুখী।
কৃষকরা এখন প্রথাগত চাষাবাদের পাশাপাশি এই নতুন সম্ভাবনার দিকে প্রবল উৎসাহে ঝুঁকছেন। এর পেছনের কারণটিও বেশ সুস্পষ্ট—সূর্যমুখী চাষে তুলনামূলক খরচ অনেক কম, অথচ লাভের অঙ্কটা বেশ বড়। বিশেষ করে দেশজুড়ে ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণে এই ফসলটি দারুণ এক বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বল্প পুঁজিতে বেশি আয়ের এই সম্ভাবনাই মূলত কৃষকদের সূর্যমুখী আবাদে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করছে।
রাউজানের কৃষক রঞ্জিত চৌধুরীর কথায় এই আশার বাস্তব প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি এবার পুরো এক হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের নিবিড় পরামর্শ আর উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে তার খেতে এবার চমৎকার ফলন হয়েছে।
রঞ্জিত চৌধুরী বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান যে, বাজারে সূর্যমুখী তেলের ব্যাপক চাহিদার পাশাপাশি এর অন্যান্য ব্যবহারও বেশ লাভজনক। তেল নিষ্কাশনের পর বেঁচে যাওয়া খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যা কৃষকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। অন্য অনেক ফসলের চেয়ে এতে সেচ ও পরিচর্যা কম লাগে বলেই এটি কৃষকদের কাছে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
চলতি মৌসুমে পুরো উপজেলা জুড়ে মোট ১৪ হেক্টর জমিতে এই ফুলের আবাদ হয়েছে। আর এই পুরো কর্মযজ্ঞের পেছনে উপজেলা কৃষি বিভাগের রয়েছে নিরলস প্রচেষ্টা।
রাউজান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুম কবির জানান, তারা কৃষকদের শুধু উৎসাহিত করেই থেমে নেই, বরং এই সাফল্যের পথ মসৃণ করতে তাদের নানাবিধ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক প্রদানসহ সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে কৃষি বিভাগ।
মাসুম কবির আরও জানান, আগামী দিনগুলোতে এই উপজেলায় সূর্যমুখী চাষ আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের জন্য তারা আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
আবহাওয়া যদি শেষ পর্যন্ত কৃষকের অনুকূলে থাকে, তবে মাঠের এই অপরূপ হলুদ ফুলগুলো অচিরেই কৃষকের ঘরে নিয়ে আসবে কাঙ্ক্ষিত লাভ। ভোজ্যতেলের ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি রাউজানের কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এই সূর্যমুখী হয়ে উঠবে এক নতুন দিগন্ত।