মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। ইরানের হামলায় সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কাতার এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার আঁচ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশবাসীকে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার থেকে তা ২০ কোটি ঘনফুট কমানো হয়েছে। সার ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কিছুটা লোডশেডিং হতে পারে। রান্নার গ্যাস পেতেও কোথাও কোথাও ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।
দেশের জ্বালানি তেল প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এছাড়া গ্যাসের চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করে আমদানি করা এলএনজি। যুদ্ধের কারণে এই আমদানি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি সভা করেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সভায় প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “জ্বালানি সরবরাহ ধীর হয়ে গেছে। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে। কিছুটা গ্যাস-সংকট হতে পারে, লোডশেডিং হলেও তা অসহনীয় হবে না।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। সবাই সহযোগিতা না করলে এই বিরাট সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। সাশ্রয়ী হলে আগামী মার্চ পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। তবে রমজানে ইফতার, তারাবিহ ও সাহ্রির সময় লোডশেডিং হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
খোলাবাজার থেকে বাড়তি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আশানুরূপ সাড়া মিলছে না বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। ঈদের ছুটিতে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে, ফলে চাপ কিছুটা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, মঙ্গলবার এলএনজি থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বুধবার তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়েছে। ঈদের ছুটি পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কাতার থেকে এলএনজি আসা বন্ধ থাকায় অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে কার্গো আনার চেষ্টা চলছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক সাংবাদিকদের জানান, এ মাসের দুটি জাহাজ নির্ধারিত সময়ে আসছে না। তাই সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে সাশ্রয় করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে পেট্রল ১৬ দিন, অকটেন ৩০ দিন এবং ফার্নেস তেলের ৭৬ দিনের মজুত থাকলেও ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ১৪ দিনের। জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি ও সময়মতো জাহাজ না পাওয়ায় ডিজেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রল বিক্রি নিষিদ্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, তেলের চেয়ে গ্যাসের সংকট বেশি প্রকট। চীন, জাপান, ভারত ইতিমধ্যে রেশনিং শুরু করেছে। সরকারের সাশ্রয়ী হওয়ার সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী। এই সাময়িক ভোগান্তি মেনে নিয়ে সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে।