
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। চলমান রমজান ও আসন্ন সেচ মৌসুমে সংকট এড়াতে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে সরকার। একই সঙ্গে গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে চট্টগ্রামের সিইউএফএল, কাফকো এবং নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে গত বুধবার জরুরি ভিত্তিতে এই এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বাভাবিক সময়ে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা খরচ হলেও বর্তমানে তা কিনতে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা লাগছে। ফলে সরকারকে বাড়তি প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভোর গ্রুপের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২৮ দশমিক ২৮ ডলারে একটি এবং ভিটলের কাছ থেকে ২৩ দশমিক ০৮ ডলারে আরেকটি এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে গানভোরের কার্গোটির দাম পড়বে প্রায় এক হাজার ২৭৯ কোটি টাকা, যা গত জানুয়ারিতে ছিল মাত্র ৫০০ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার এক পরিচালক জানান, গানভোরের কার্গোটি ১৫ থেকে ১৬ মার্চ এবং ভিটলের কার্গোটি ১৮ থেকে ১৯ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মার্চ মাসের জন্য নির্ধারিত ৯টি কার্গোর মধ্যে চারটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করলেও দুটি জাহাজ এখনও আটকে আছে। শুরুতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো সাড়া না মেলায় সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই দুই কার্গো কেনা চূড়ান্ত করে পেট্রোবাংলা।
দেশে প্রতিদিন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি কার্গোতে প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস থাকে। একটি জাহাজ আটকে গেলে দেশে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দিনে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করবে।
তবে গ্যাস রেশনিংয়ের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশের সার উৎপাদনে। গত বুধবার বিকেল ৩টা থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী সার কারখানার (কাফকো) উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিদিন সিইউএফএল প্রায় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টন ইউরিয়া এবং কাফকো এক হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া ও এক হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করত।
নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ফখরুল আলম জানান, দুই হাজার ৮৪০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানার উৎপাদনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি কারখানা বন্ধ থাকায় দৈনিক ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হলেও বোরো মৌসুমে বড় ধরনের সার সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের এই ডামাডোলে এলপিজি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারিভাবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জাহাজ ভাড়া টনপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা জানিয়ে এলপিজি আমদানিকারকরা জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। সরকার ফ্রেইট চার্জ টনপ্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২১ ডলার করলেও তা মানতে নারাজ ব্যবসায়ীরা।
তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান বাজারের এলপিজি আগের দামে আনা, তাই দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আগামী মাসে জাহাজ ভাড়া পর্যালোচনা করে নতুন দাম সমন্বয় করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি হওয়ায় দেশে কোনো সংকট নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।