সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রবাসে নারী কর্মীদের স্বপ্নভঙ্গ, ৭ বছরে ফিরলেন ৭০ হাজার

বিদেশে চরম নির্যাতনের শিকার নারীরা, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৭ মার্চ ২০২৬ | ১২:২৬ অপরাহ্ন


ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি নারী কর্মীদের অনেকেই ফিরছেন শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে। গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন, যাদের অনেকেই নিয়ে এসেছেন অমানবিক নিপীড়নের অভিযোগ।

ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারানো পটুয়াখালীর লিজা আক্তারের গল্পটা অনেকের মতোই। বিয়ের পর স্বামী ছেড়ে গেলে দুই সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় বছর দুয়েক আগে সৌদি আরবে যান তিনি। কিন্তু সেখানে চারবার হাতবদল আর অমানবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরতে বাধ্য হন লিজা। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে পাঠায়। এখন তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

মৌলভীবাজারের বড়লেখার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজে। দীর্ঘ সময় কাজ, কম খাবার আর নির্যাতনের এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক ও পিবিআইয়ের সহায়তায় ১৩ দিন পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরতে পারলেও, বর্তমানে তার মানসিক চিকিৎসা চলছে।

লিজা বা রিজিয়ার মতো অসংখ্য নারী আজ এই করুণ পরিণতির শিকার। গত এক দশকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনাও। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে কতজন ফিরেছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। এদের বেশিরভাগই নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।

আগামীকাল ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। দেশে ও প্রবাসে থাকা সব নারীর অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছে এই প্রতিপাদ্য।

১০ লাখ নারী বিদেশে, অধিকাংশই সৌদি আরবে

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করলেও ২০০৪ সাল থেকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা বছরে লাখ ছাড়িয়ে যায়। করোনা মহামারি ছাড়া ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি নারী বিদেশে গেছেন।

গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সৌদি আরবে গেছেন। এদের অনেকেই ভাগ্য বদলালেও, অনেকেই ফিরেছেন নিপীড়নের ক্ষত নিয়ে।

সাত বছরেই ফিরেছেন অন্তত ৭০ হাজার

বিদেশ থেকে কতজন নারী ফিরেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী ফিরেছেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে শুধু ২০২০ সালেই ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু সৌদি আরব থেকেই ১৫ হাজারেরও বেশি নারী দেশে ফিরেছেন।

ফিরে আসাদের অভিযোগ নিপীড়নের

দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং অতিরিক্ত কাজের অভিযোগ করেছেন। ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরেছেন।

কুড়িগ্রামের এক নারী গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পরে দেশে ফেরেন। রংপুরের এক নারীকে শারীরিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় গায়ে আগুন দেওয়া হয়। যশোরের এক নারীকে গৃহকর্তা, তার ছেলে এবং ছেলের বন্ধুরা যৌন নির্যাতন করেছে। মানিকগঞ্জের এক নারী নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে চারতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন। কুমিল্লার এক নারীকে নির্যাতন করে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়।

সুনামগঞ্জের হোসনে আরা, দিলরুবা আক্তার, জান্নাত, পহেলী আক্তার, ইতি আক্তারের মতো অনেকেই বিদেশে গিয়ে নানাভাবে শোষণ, নির্যাতন ও পাচারের শিকার হয়েছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেও শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, নিয়মিত বেতন না দেওয়া এবং পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

লাশ হয়ে ফিরেছেন অন্তত ৮০০ জন

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এদের বেশিরভাগের মৃত্যু সনদে কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ থাকলেও পরিবারগুলো তা মানতে নারাজ।

মিশরে মারা যাওয়া বেগম, সৌদি আরবে মারা যাওয়া আবিরুন বেগম ও নাজমার মৃত্যু নিয়ে রহস্য এবং নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

ফরিদপুরের সুফিয়া বেগম বলেন, “অনেক সময় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেকে আত্মহত্যা করেন। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আমি নিজের গলায় নিজে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলাম।”

সংকট সমাধানে সুরক্ষা ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, বিদেশে নারীদের ওপর নির্যাতনের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন, কারণ অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেন না। তবে যেসব চিত্র উঠে আসে তা ভয়াবহ।

তিনি বলেন, নারীদের অভিযোগগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: কাজ ও বেতন সংক্রান্ত, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতন। তিনি অভিযোগ করেন, নিপীড়নের শিকার নারীদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকে না।

শরিফুল হাসান বলেন, “অধিকাংশ সময় ট্রাভেল পাস দিয়ে একজন নারীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ট্রাভেল পাস দেওয়ার আগে দূতাবাসকে ওই নারীর কথা শুনতে হবে এবং লিখিত অভিযোগ নিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাগুলো তদন্তের অনুরোধ করতে হবে যাতে নিপীড়নকারীরা শাস্তির আওতায় আসে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রায় আটশ নারীর লাশ এসেছে গত আট বছরে। বলা হয় এদের অনেকে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু… তাঁরা এমন কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছেন যে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।”

গৃহকর্মীর বদলে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য কাজে পাঠানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাতেই চায়, তবে বাছাই ও প্রশিক্ষণ যথাযথ করতে হবে। প্রত্যেক নারীর যোগাযোগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিপদে পড়লে রাষ্ট্র ও দূতাবাসকে পাশে থাকতে হবে।

তিনি জানান, ফেরত আসা নারীদের পুনরেকত্রীকরণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। “প্রায়ই নারী নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা হয়। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের এত এত ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। কারণ প্রত্যেকে একজন মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ। একজন নারীর কান্না মানে পুরো বাংলাদেশের কান্না,” যোগ করেন শরিফুল হাসান।