সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

লবণ মাঠে তিন নারীর হার না মানা জীবনযুদ্ধ

হিরু আলম | প্রকাশিতঃ ৮ মার্চ ২০২৬ | ১:০৩ অপরাহ্ন


আজ রোববার, ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। চারদিকে যখন নারীর অধিকার ও সমতার জয়গান, তখন জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অবিরাম যুদ্ধ করে চলেছেন একই বাড়ির তিন নারী। জন্ম থেকেই যাঁদের শুরু হয়েছে টিকে থাকার সংগ্রাম। জীবন পদে পদে তাঁদের অগ্নিপরীক্ষা নিচ্ছে, কিন্তু ছেমন আরা, পারভীন আক্তার ও বুলু আক্তার নামের এই তিন নারী থমকে যাননি। অভাবের কশাঘাতে ক্লান্ত হলেও তাঁরা কখনোই জীবনের কাছে হার মানেননি।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের হাজীপাড়ায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম ছেমন আরার। দিনমজুর বাবা-মায়ের সংসারে তাঁর শৈশব কেটেছে অপুষ্টি আর অনাহারে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর পাড়া-প্রতিবেশীর সহযোগিতায় এক দিনমজুরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। বিয়ের বছর খানেক পর তাঁদের ঘর আলো করে আসে মেয়ে পারভীন আক্তার। ছেমন আরার ভাষায়, খেয়ে না খেয়ে জীবন ধারণ করলেও মেয়ে পারভীন আক্তারের মুখের হাসিতে তিনি সব কষ্ট ভুলে থাকতেন।

কিন্তু পারভীন আক্তারের বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন হঠাৎ করেই ছেমন আরার স্বামীর মৃত্যু হয়। স্বামী হারিয়ে ছেমন আরা অথৈ সাগরে পড়েন। শ্বশুরবাড়ির মানুষের নির্যাতনে একসময় বাধ্য হয়ে বাবার ভিটায় আশ্রয় নেন তিনি। শুরু হয় আরেক নির্মম সংগ্রাম। মেয়ের মুখে ভাত তুলে দিতে কখনো ধানের মাঠে, কখনো মানুষের ঘরে দিনমজুরি করেছেন। কাজ না জুটলে ভিক্ষার ঝুলি হাতে বেরিয়ে পড়েছেন। এভাবেই ভিক্ষা করে মেয়ে পারভীন আক্তারের বিয়ে দেন এক দিনমজুরের সঙ্গে। পারভীন আক্তারের কোলে আসে এক প্রতিবন্ধী ছেলেসন্তান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কিছুদিন পরই স্বামী পারভীন আক্তারকে ফেলে চলে যান। বাধ্য হয়ে পারভীন আক্তারও প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে মা ছেমন আরার ভাঙা ঘরেই আশ্রয় নেন।

ছেমন আরার বাবার ভিটায় থাকেন তাঁর একমাত্র ভাই আব্দুল করিম। শহরে দারোয়ানের কাজ করা আব্দুল করিম হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। আব্দুল করিমের দুই ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেলে বৃদ্ধ বয়সে স্বামীর চিকিৎসা ও ভাতকাপড়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর স্ত্রী বুলু আক্তার। এই চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই ছেমন আরা, পারভীন আক্তার ও বুলু আক্তার মিলে শুরু করেন লবণ চাষ। জমিদারের কাছ থেকে দাদন নিয়ে তাঁরা মাঠে নামেন। শর্ত হলো, উৎপাদিত লবণের অর্ধেক পাবেন জমিদার আর বাকি অর্ধেক এই তিন নারী। কিন্তু এবারও লবণের দাম কম হওয়ায় তাঁরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে তীব্র রোদের মধ্যে লবণের মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন এই সংগ্রামী নারীরা। আড়াই কানি জমিতে বুলু আক্তার কুয়ো থেকে পানি তুলে দিচ্ছেন, আর পারভীন আক্তার লবণ গুছিয়ে রাখছেন। আরেকজন প্রতিবেশী নারীও তাঁদের সাহায্য করতে এসেছেন। তবে বয়সের ভারে ক্লান্ত ছেমন আরা সেদিন মাঠে আসতে পারেননি।

জানা যায়, বছরে ১২ হাজার টাকা লাভের শর্তে তাঁরা ৫০ হাজার টাকা ধার করে লবণ মাঠে বিনিয়োগ করেছেন। প্রতি কানি মাঠে পলিথিন, শ্রমিক ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এক কানি থেকে মৌসুমে ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ লবণ পাওয়া যায়। বর্তমানে মণপ্রতি লবণের দাম ২২০ টাকা হলেও পরিবহন খরচ বাদে চাষিদের হাতে থাকে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। এর অর্ধেক আবার চলে যায় জমিদারের পকেটে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে উৎপাদন আরও কমে যায়।

এই তিন নারীর জীবনযুদ্ধ নিয়ে রাজাখালী ইউনিয়ন লবণ মৎস্য ও কৃষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হালিম জানান, এই নারীরা জন্ম থেকেই অসহায়। ভাগ্য বদলাতে তাঁরা লবণ চাষ শুরু করেছেন এবং সমিতির পক্ষ থেকে তিনি তাঁদের সার্বিক সহযোগিতা করবেন। সরকার লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে তাঁদের মুখে হাসি ফুটবে বলে আব্দুল হালিম আশা প্রকাশ করেন।

উপজেলা মহিলা সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সাকেরা শরীফ তাঁদের কথা শুনে গভীরভাবে মর্মাহত হন। তিনি জানান, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে তিনি ওই নারীদের জন্য উপযুক্ত অনুদানের ব্যবস্থা করবেন।

অন্যদিকে, পেকুয়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, সমাজসেবা কার্যালয় সব সময় দেশের প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের পাশে আছে। এই তিন নারীর অসহায়ত্বের বিষয়টি জানার পর খুব শিগগিরই তাঁদের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে আবুল কালাম আজাদ প্রতিশ্রুতি দেন।